লেখা আহবান
প্রিয় লেখক বন্ধু, আপনার লেখা সবচেয়ে সুন্দর উপন্যাস, সায়েন্স ফিকশন, ভ্রমণকাহিনী, ফিচার, স্বাস্থ্য কথা ইত্যাদি পাঠিয়ে দিন এই মেইলে– noborongpotrika@gmail.com
শুকনো অশ্রু

শুকনো অশ্রু

তোফাজ্জল হুসাইন

১.

সন্ধ্যার পর থেকে মনটা কেমন হু হু করছে। কোন কিছুই ভালো লাগছেনা। মনে হচ্ছে একশো কেজি ওজনের একটা পাথর বুকে চাপিয়ে রাখা হয়েছে। দম প্রায় বন্ধ হয়ে আসার মতো। এখন বসে আছি মেঘনা নদীর তীরে। পাশেই একটা ডগ থেকে ঝালাইয়ের কর্কট শব্দ কানে আসছে। এখানে বড় বড় লঞ্চ, জাহাজ, স্টিমার মেরামত করা হয়। এটা একটা বিরাটকার ঘাট। সাড়ি সাড়ি লঞ্চ বাধা। নদীর মাঝখানে তেলের জাহাজ স্থির দাড়ানো। স্টিমারগুলোতে লোকেরা রান্না চড়িয়েছে। কেউ গোসল করছে, তো কেউ ক্লান্ত শরীর নিয়ে গান ধরেছে। এই জায়গাটায় বসলে আমার মনটা একটু হাল্কা হয়। অতীতের কথা মনে হতে থাকে।

২.

ছোটবেলা, মা, বাবা, আমাদের ছোট্ট ঘর। যেখানে বসে আছি তার উত্তর পূর্বকোণে নদী বাক খেয়েছে। এখান থেকে একটু দূরেই ছিল আমাদের ছোট্ট ঘরটি। বাবা জমিতে কাজ করতেন। আর মা এর বাড়ি ওর বাড়ি কাজ করতেন। অনেক কষ্টে আমাদের দু’মুঠো ভাত জোগাড় হতো। আমি সারাদিন এদিক-ওদিক ছুটোছুটি করতাম। ছিলনা কোন পড়াশোনা, ছিলনা ইস্কুলে যাওয়ার তাগাদা। মাঝেমাঝে মা আমাকে সঙ্গে নিয়ে যেতেন। তখন দেখতাম সাহেব বাড়ির ছোট ছেলে-মেয়েদের কত বাহারি খেলনা। সুন্দর সুন্দর জামা-কাপড়। আমার খুব লোভ হতো। একদিন আমি একটা খেলনা লুকিয়ে নিয়ে আসি। এটা জানতে পেরে পরদিন মাকে অনেক মারধর করে সাহেব বাড়ির অন্য কাজের লোকেরা। মা বাড়িতে এসে অনেক কেঁদেছিলেন। বাবা অন্যের জমিতে কাজ করতেন। খুব অল্প রোজগার ছিল উনার। এভাবেই ভালো ছিলাম আমরা। কিন্তু এই টানাপোড়ার সংসারে একদিন নেমে আসে দৈত্যাকারের দুঃখ। নদীর ভাঙ্গনে তলিয়ে যায় আমাদের ঘরটি। শুধু হাতে গুনা কয়টা হাড়ি পাতিল আর কয়েকটা কাপড়-চোপড় ছাড়া সব কিছু ভেসে যায় নদীর পানিতে। আমরা এসে উঠলাম স্টেশন পার্শ্ববর্তী তাবু গেড়ে থাকা মানুষদের সাথে। এখন আমি সারাদিন স্টেশনেই কাটাই। মা বাসায় বাসায় কাজ করে। আর বাবা এখানে প্রতিদিন কাজের তালাশে বের হয়। কোন দিন কাজ পায় আবার কোনদিন সন্ধ্যায় শুকনো মুখে ফিরে আসে।

৩.

আবির চলো বাসায় যাবে। হঠাৎ করে সেলিম আংকেলের ডাকে আমার স্থিতি ফিরে আসে।
-আমাদের ডগে যে কাজটা ছিলো সেটা প্রায় সম্পূর্ণ হয়ে গেছে। (সেলিম আংকেল)
-ওহহ, আচ্ছা চলুন।

এখন আমার বয়স ২৮ এর কাছাকাছি। এই ডগে আমার ৪০% শেয়ার। এমন আরো দুটি ডগে শেয়ার আছে। জুতো বানানোর একটা ফ্যাক্টরি এবং মশার কয়েল আর কর্ণফুলী খাতা বানানোর ফ্যাক্টরি। এই সবগুলো দেখাশোনা করেন সেলিম আংকেল। কাগজে-কলমে কোন প্রয়োজন হলে আমাকে আসতে হয়। শহরে কয়েকটা বিল্ডিং ভাড়া দেওয়া। আর ওখানের একটা এপার্টমেন্টে এখন থাকি। কিন্তু মাঝেমধ্যে এখানে আসা হয়। কখনো কাজে আবার কখনো কোন কাজ ছাড়াই। এই নদী আমাদের সব ছিল। তাকে ঘিরেই আমাদের বেঁচে থাকা। জীবনের আরেকটা অর্থ বুঝতাম এই মেঘনা নদী। কিন্তু কোন এক সময়ে এই নদী আমাদের সব কেড়ে নেয়। নিঃস্ব করে আমাদের। কখন এতো রাত নেমে এলো বুঝতেই পারিনি। লঞ্চগুলোর কোনটিতে বাতি নিভে গেছে। মাঝেমধ্যে কোন একটা থেকে আলো এসে পড়ছে নদীর পানিতে। ডগে আর ঝালাইয়ের শব্দ হচ্ছে না। সব কেমন সুনসান নিরবতায় ঘিরে গেছে। সেলিম আংকেল আবার ডাকলেন।
-আবির, চলো আমাদের যেতে হবে।

৪.

আজকে মায়ের মৃত্যুবার্ষিকী। প্রতিবছর এইদিনে আমি স্টেশনে এসে দরিদ্রদের খাবার খাওয়াই একবেলা। এখানে আসলে মায়ের কথা খুব মনে পড়ে। স্টেশনের পাশের তাবু’র বস্তিটাতে খুশির রব পড়েছে। এদিক-সেদিক ছুটাছুটি, হই-হুল্লোড়ে মেতে আছে ছোট থেকে বড় সবাই। এই দিনটা সবাই উপভোগ করে। বড়দের শাড়ী, লুঙ্গী আর ছোটদের দেওয়া হয় বাহারি রঙ্গের জামা। সেলিম আংকেল খুব ব্যস্ত। সাথে অনেক লোক। তবুও যেন সামাল দিতে কষ্ট হচ্ছে। আমি একটা চেয়ারে বসে আছি। মায়ের কথা খুব মনে পড়ছে। একসময় এখানে থাকতাম আমরা। মা সারাদিন কাজ করে সন্ধ্যায় এসে রান্না চড়াতেন। আমি সারাদিন এদিক-সেদিক সময় কাটাতাম। কিছু খাবার পেলে খেতাম না হয় মায়ের রান্না শেষ অব্ধি অপেক্ষা করতে হতো। বাবা কাজ পেলে হাসিমুখে ঘরে ফিরতেন। ষোলবছর আগের ঠিক এই দিনটায় মা মারা যান, নৃশংস মৃত্যু। কাজ শেষে ঘরে ফেরার সময় ট্রেনের নিচে কাটা পরেন মা। কাটা-ছেড়া অংশের কবর দেওয়া হয়। বাবা শোকে পাথর হয়ে যান। খুব ভালোবাসতেন মাকে। কতো কঠিন সময় দুটি মানুষ হাতে হাত রেখে পার করেছে। দুনিয়ার কাছে হার মানেনি কখনো। কেউ কাউকে ভেঙ্গে পড়তে দেয়নি। বাবা অনেকদিন কোন কথা বলেননি। স্টেশনে একটা কোণায় বসে থাকতেন চুপচাপ। আমি স্টেশনে এটা-সেটা করে চলতাম। কখনো কখনো স্টেশন থেকে অনেক দূরে চলে যেতাম। আবার কিছুদিন পর ফিরে আসতাম। একসময় বাবাকে আর স্টেশনে পাওয়া গেলনা। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও কোন খবর পাওয়া গেলনা। বাবা-মায়ের জন্য আমার খুব কান্না পেতো। কিন্তু আমার শুকনো অশ্রু কারো দৃষ্টিগোচর হয়নি। সেলিম আংকেল আমার দিকে এগিয়ে আসছেন।
-আবির চলো সবার সাথে খাবে।

৫.

চট্টগ্রাম বন্দরে একটা চুক্তিপত্র সাইন করতে এসেছি। একটা শো-রুম কোম্পানি আমার থেকে জুতো বানাতে চায়। সেলিম আংকেল সব বন্ধবস্ত করে রেখেছেন। আমরা একটা হোটেলে উঠেছি। কাল কাজ শেষ করে আবার ফিরে যাবো। জুতার কাজ থেকেই আমার সফলতা শুরু। দুনিয়ার বিচিত্র নিয়মে খুব অল্প সময়ে আমি এই জায়গায় পৌঁছেছি। একটা কথা খুব সত্যি মনে হয়। আল্লাহ যাকে দেন তাকে ঢেলে দেন। আমার পড়াশোনা একদম নেই। শক্ত হাতে কাজ করেছি। পরিশ্রমকে দুনিয়া ভেবেছি। আজকে কাজ করলেই কালকে আমি এই জগতে ঠাই পাবো। খেতে পারবো, পরার কাপড় পাবো। কাজই আমাকে সফলতা এনে দিয়েছে। সকালে হোটেল থেকে বের হয়েছি। গাড়ি এসেছে আমাদের নিয়ে যেতে। সিগনালে গাড়ি দাড়িয়ে আছে। সেলিম আংকেল সামনে ড্রাইভারের পাশে। পেছনে আমি একা। গাড়ি থেকে নেমে গেলাম। প্রথমে আংকেল খেয়াল করেনি। আমি দৌড়ে সামনের দিকে যাচ্ছি। সেলিম আংকেল গাড়ি থেকে নামলেন। ডাকলেন আমাকে। আমি দৌড়ে পথের এপাশ থেকে অন্য পাশে চলে আসলাম। ঠিক, আমার চোখ একটুও ভুল দেখেনি। বাবা বসে আছেন পথে। ছেড়া প্যান্ট, নোংরা শার্ট। চুল-দাড়ি শরীরের যত্রতত্র অবস্থায় বাবা হাইওয়ের পাশে বসে আছেন। ততক্ষণে আংকেল চলে এসেছে। উনি বাবাকে চিনতে পারলেন না। আমার মুখে বাবা-মায়ের অনেক গল্প শুনেছেন সেলিম আংকেল। কিন্তু উনাদের কখনো দেখেননি। বাবাকে নিয়ে আমরা হোটেলে চলে আসলাম। পরিষ্কার করে, খাইয়ে বাবাকে বিশ্রাম করতে দিলাম। এখনো বাবা কথা বলতে পারেন না। হয়তো আমাকে চিনতেও পারেনি। আমি আবির। উনার ছোট্ট ছেলে আবির।

নরসিংদী।

দয়াকরে লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০১৮-২০১৯ নবরঙ
Design BY NewsTheme