লেখা আহবান
প্রিয় লেখক বন্ধু, আপনার লেখা সবচেয়ে সুন্দর উপন্যাস, সায়েন্স ফিকশন, ভ্রমণকাহিনী, ফিচার, স্বাস্থ্য কথা ইত্যাদি পাঠিয়ে দিন এই মেইলে– noborongpotrika@gmail.com
নবান্নের হেমন্ত আহ্বান

নবান্নের হেমন্ত আহ্বান

কাঞ্চন দাশ

শরতের রেশ কাটতে না কাটতেই আগমন ঘটলো হেমন্তের। শান্ত হিমেল সমীরণে প্রকৃতি সেজেছে নতুন করে। বাতাসে শীতের গন্ধে মন চনমন করে ওঠে। পূর্বে সারাটি বছর এই শীতকালের জন্যে অপেক্ষার প্রহর কাটতো। শীতে যতই কষ্ট হোক, কষ্ট মনে হয় না, গরমকালে যতটা কষ্ট হয় তার থেকে। রুমের পশ্চিমের জানালা দিয়ে ঠান্ডা বাতাস যখন আসে প্রাণ-মন সব জুড়িয়ে যায়। এইসময়ে ব্যালকনির পশ্চিম-উত্তর কোনে দাড়ালে বাতাসে গ্রামের গন্ধ পাই। বুকভরে শ্বাস নেই। খড়-মাটির মিশেল মাতাল করা সেই গন্ধে যে কী সুখ, কী যাদুকরি ভাললাগা সেটা কাউকে বোঝাতে না পারলেও নিজে ঠিকই উপভোগ করি।

স্নিগ্ধ হেমন্তকাল যেন আমাদেরকে একটু বেশিই বিমুগ্ধ করে। সকালে ধানগাছের ডগায় যে শিশির জমে থাকে তা হেমন্তের মায়াবী রূপের এক ঝলক সৌন্দর্যেরই পূর্বাভাস জানান দেয়। সকালের প্রথম রোদের বর্ণচ্ছটায় গাছের পাতাগুলো যেন হেসে ওঠে। দৃষ্টিসীমা যতদূর যায়, দেখা যায়, আলোকোজ্জ্বল অপূর্ব একটি সকাল তার অভাবনীয় সৌন্দর্য নিয়ে যেন অপেক্ষমান। গাছের নরম-কচি পাতাগুলোর ফাঁকে ফাঁকে মিষ্টি রোদ আর সুনীল আকাশ যেন হাতছানি দিয়ে ডাকে।

হেমন্তকে বলা হয় বৈচিত্রময় রঙের ঋতু। হেমন্তকাল হলো পাতাঝরার দিন। হেমন্তে নবসাজে সেজে ওঠে পাহাড়ের অরণ্যে গাছপালা, যেন তখন হয়ে ওঠে সর্বত্র সবুজের সমারোহ। একসময় বাংলায় বছর শুরু হতো হেমন্ত দিয়ে। কারণ, ধান উৎপাদনের ঋতু হলো এই হেমন্ত। বর্ষার শেষদিকে বোনা আমন-আউশ শরতে বেড়ে ওঠে। আর হেমন্তের প্রথম মাস কার্তিকে ধান পরিপক্ক হয়। এ ঋতুতে ফোটে গন্ধরাজ, মল্লিকা, শিউলি, কামিনী, হিমঝুরি, দেবকাঞ্চন, রাজ অশোক প্রভৃতি |

শরতের ঘনঘটাকে দূরে ঠেলে দিয়ে হেমন্ত তার জায়গা দখল করে নিয়েছে। সাজিয়েছে তার রূপ দিয়ে প্রকৃতিকে। কোথাও যেন কোনো কমতি নেই‚ নেই কোনো অবসান। প্রকৃতির অবয়ব ঢেকে দিয়েছে সৌন্দর্যের রূপ দিয়ে। হেমন্তের নবান্ন উৎসবে গ্রামের পাড়া-মহল্লার উঠোন ভরে উঠে নতুন ধানের গন্ধে। চারিদিকে শুরু হয় হৈ চৈ। নতুন ফসলের ছন্দে মেতে উঠে সবাই।

বাংলার ষড়ঋতুর পালাবদলে আসছে হেমন্তকাল এ সময়ে আকাশ সাজে নানারূপে। কখনো নীলচে সাদা, কখনোবা গাঁয়ে সন্ধ্যার সোনারঙ মাখে। আকাশে ভেসে বেড়ায় সাদামেঘের ভেলা। বাতাসে, রোদ্দুরে কেমন যেন একটা মিষ্টি ভাব লেগে থাকে সারাক্ষণ। সন্ধ্যার আকাশে তারার মেলা। যেন রঙিন করে সেজেছে আকাশ। বাংলাদেশের প্রকৃতির কত রূপ, কত বিভা। শিল্পীরা শ্যামল প্রকৃতির এই রূপকে ধরে রাখেন রং-তুলি-ক্যানভাসে, কখনো তেলরঙে, কখনো বা জলরঙে।

কাজী নজরুল ইসলামের ‘অঘ্রাণের সওগাত’ কবিতায় নবান্নের চিত্রটি বেশ উপভোগ্য। হেমন্ত ঋতুকে নিয়ে কবি সুফিয়া কামালের ছড়া-কবিতা হেমন্ত:

“সবুজ পাতার খামের ভেতর
হলুদ গাঁদা চিঠি লেখে
কোন্ পাথারের ওপার থেকে
আনল ডেকে হেমন্তকে?”

বিশ্বকবি তাঁর “নৈবদ্যে স্তব্ধতা” কবিতায় লিখেছেনঃ

“আজি হেমন্তের শান্তি ব্যাপ্ত চরাচরে
জনশূন্য ক্ষেত্র মাঝে দীপ্ত দ্বিপ্রহরে
শব্দহীন গতিহীন স্তব্ধতা উদার
রয়েছে পড়িয়া শ্রান্ত দিগন্ত প্রসার
স্বর্ণশ্যাম ডানা মেলি।”

হেমন্তের আগমনে প্রকৃতির পরিবর্তনের আভাস উল্লেখ করা হয়েছে গানের বাণীতে। ঘরে ঘরে আহ্বান এসেছে, আলো জ্বালানো। কবির মতে, হেমন্তে সোনালি ফসলে প্রকৃতির আভায় নতুন ছবি ফুটে উঠেছে। সেখানে আছে এক অনাবিল প্রশান্তি। জনমানবহীন চরাচরে নেই কোনো শব্দ, গতি। রয়েছে স্তব্ধতাও।

নদী বয়ে চলে তার আপনমনে। নেই কোনো বাধা‚ নেই কোনো স্তব্ধতা‚ মনের আনন্দে নেচে বেড়ায় মৌমাছি‚ জোনাক পোকা। জোনাকিপোকা তার আলো ছড়িয়ে দেয় সবখানে। গ্রামে শুরু হয় ব্যস্তময় জীবন ধান ভাঙা ও ঢেঁকির আওয়াজ। আমি মুগ্ধ‚ আমি ধন্য‚ বাংলার কোলে জন্ম নিয়ে। তাই আজ নিজে নিজে গেয়ে উঠিঃ

“সোনার ধানের মধুর গন্ধে
এসেছে হেমন্ত‚
মেতে উঠে গ্রামবাসীরা
সুখের নেই অন্ত।
নবান্নের উৎসবে মেতে উঠে পাড়া‚
সবার মাঝে ভরে উঠুক আনন্দের ধারা।”

সুন্দরপাড়া বন্দর‚ চট্টগ্রাম।

দয়াকরে লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০১৮-২০১৯ নবরঙ
Design BY NewsTheme