লেখা আহবান
প্রিয় লেখক বন্ধু, আপনার লেখা সবচেয়ে সুন্দর উপন্যাস, সায়েন্স ফিকশন, ভ্রমণকাহিনী, ফিচার, স্বাস্থ্য কথা ইত্যাদি পাঠিয়ে দিন এই মেইলে– noborongpotrika@gmail.com

লম্বু জনি

ইকবাল খন্দকার

পর্ব- তেরো


জনি তার মামাকে ফোন করে। মামা ফোন ধরেই বলেন-তোর জন্যে খুব মায়া হয়রে জনি। আমার মত তুইও সেঞ্চুরি করতে চাইলি, অথচ তোর ইচ্ছেটা পূরণ হলো না। ফেঁসে গেলি। তোর কপালটাই খারাপ। কপাল খারাপ দেখেই এমন দারোগা টাইপ হেড মাস্টারের হাতে পড়েছিস। শিক্ষক হলেও আসামী ধরার কায়দা ভালোই জানে। জনি মামার কথা চুপ করে শুনে যায়। হ্যাঁ না কিছুই বলে না। মামা জিজ্ঞেস করেন-কীরে, চুপচাপ কেন? হেড মাস্টারের চাপে কথা বলাও কমিয়ে দিয়েছিস নাকি? ভালোই করেছিস। স্কুল পাল্টানোর ক্ষেত্রে সেঞ্চুরি করতে না পারলেও দুনিয়ায় বাঁচার ক্ষেত্রে সেঞ্চুরি করতে পারবি। মানে একশো বছর বাঁচতে পারবি। কথা কম বললে আয়ু বাড়ে জানিস তো?
এবার মামার কথার লাগাম টেনে ধরে জনি। ফোন করার উদ্দেশ্যটা আগাগোড়া বলে। মামা বলেন-তোকে সরি বলা ছাড়া আমার আর কিছুই করার নেইরে। কদিন পরপর চাকরি বদলানোর কারণে আমার হাতে জমানো কোন টাকা নেই যে তোকে দেবো। তবে আমি একজনের কাছে হাজার দশেক টাকা পাই। তুই যদি বলিস তাহলে এই টাকাটা নিয়ে তোকে দিতে পারি। তবে টাকাটা যার কাছে পাই, সে আবার পিছলা ধরনের মানুষ। চাইলেই পেয়ে যাবো, এই বিশ্বাসও তার উপর করা যায় না। মিনিমাম এক মাস সময় তো সে চাবেই। তবু চেয়ে দেখি, কী বলিস? কীরে, কথা বলছিস না কেন? মামার উপর রাগ হচ্ছে? অভিমান করেছিস?
-অভিমান করবো কেন?
-তোর গলা শুনেই আমি বুঝতে পারছি তুই অভিমান করেছিস। তোকে আমি চিনি না?
-মামা, তোমার বন্ধু বান্ধবের মধ্যে কি এমন কেউ আছে, যে অন্তত এক দুই লাখ টাকা দিয়ে হেল্প করবে?
-পাগল! তোর এই মামা হচ্ছে বাউন্ডুলে কিসিমের মানুষ। বাউন্ডুলের কিসিমের মানুষের এতো ধনী বন্ধু বান্ধব থাকে?
-ঠিক আছে, তাহলে রাখি।
-আচ্ছা, রাখ। ভালো থাকিস।
কথা শেষ করে মোবাইলটা টেবিলে রেখে দেয় জনি। এখন সে শুয়ে থাকবে। আগামীকালের ক্লাসের জন্যে অংক করা দরকার। কিন্তু কিছুই ভালো লাগছে না। সেলিমের করুণ মুখটা বারবার চোখে ভেসে উঠছে। জনি পাশ ফিরে শুতেই মোবাইল বেজে উঠল। মামার ফোন। এইমাত্র কথা হলো, আবার কিসের ফোন? ফোনটা রিসিভ করতে মন চায় না জনির। কিন্তু এতো শব্দ করে বাজছে, তা ধরে উপায়ও নেই। জনি ফোনটা রিসিভ করতেই মামা বলেন-আমি বাউন্ডুলে কিসিমের মানুষ বলে ভাবিস না আমার দু চারজন ক্ষমতাবান মানুষের সাথে সুসম্পর্ক নেই। তোদের এলাকার এমপি খায়রুল সাহেব আছেন না, তার সঙ্গে আমার খুবই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। আমি তাকে ফোন করে সব বলে দিচ্ছি। তুই আগামীকাল তার কাছে যা। ভালো হেল্প পাবি।
এমপি খায়রুল সাহেবের বাড়ির গেস্টরুমে বসে আছে জনি। তার জন্যে চা এসেছে, বিস্কুট এসেছে। জনি বিস্কুটে কামড় দিচ্ছে আর দরজার দিকে তাকাচ্ছে। দরজা দিয়ে এমপি সাহেবের থাকার ঘরের দরজা পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। এমপি সাহেবের কোন খবর নেই। অবশ্য যে চা বিস্কুট দিয়ে গেছে, সে বলেছিল বিশ মিনিট বসার জন্যে। বিশ মিনিট পার হয়ে গেছে আরো আগেই। এমপি সাহেবের খোঁজ নেই। জনি চায়ে চুমুক দিয়ে দেখে চা ঠান্ডা হয়ে গেছে। সময়মত চুমুক দেওয়ার কথা খেয়াল ছিল না। তবু সময় কাটানোর জন্যে সে ঠান্ডা চা-ই খেতে থাকে। চা যখন প্রায় শেষ, তখন এমপি সাহেব এসে হাজির হন। জনি দাঁড়িয়ে সালাম দেয়।
-তোমার মামার কাছে ছেলেটার কথা শুনলাম। খুব কষ্ট লাগল।
-ওর জন্যে কিছু একটা করতে হবে আংকেল।
-অবশ্যই অবশ্যই। একটা গান আছে না-‘মানুষ মানুষের জন্য।’ মানুষ যদি মানুষের বিপদে পাশে না দাঁড়ায়, তাহলে হবে কী করে? আর তোমাকে আমি অন্তর থেকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি, কারণ এই বয়সেই তোমার মধ্যে মানবিক গুণ তৈরি হয়েছে। তুমি ছেলেটার জন্যে কিছু করতে চাইছো। বলো, ওর জন্যে কী করা যায়। তোমার কী পরিকল্পনা।
-মামা তো নিশ্চয়ই আপনাকে বলেছে ওর অপারেশনে কী পরিমাণ টাকা লাগবে। আমি চাচ্ছিলাম আপনি যদি কোনভাবে টাকাগুলো যোগাড় করে দিতেন। সব টাকা আপনার নিজের দিতে হবে না। আপনি যদি কোন জনসভায় ওর ব্যাপারে মানুষকে একটু বলেন, তাহলে সবাই দান করবে। আপনার কথা সবাই শুনবে। শুনেছি আপনার জনসভায় হাজার হাজার মানুষ আসে। তারা যদি অল্পকিছু টাকা করেও দান করে, ওর অপারেশন হয়ে যাবে।
-তোমার মধ্যে শুধু মানবিক গুণই আছে তা না, বুদ্ধিও আছে। আমি তোমার অনুরোধ রাখবো। আগামী পরশুদিন চন্দনপুর স্কুল মাঠে আমার একটা জনসভা আছে। আমি সেখানে ওর ব্যাপারে বলবো। এবার বলো, ছেলেটার নাম বলো। তার বাবার নাম বলো। তোমার মামা অবশ্য ছেলেটার নাম বলেছিল। আমি ভালোভাবে শুনিনি। নেটওয়ার্ক সমস্যা করছিল। এখন বলো। কাগজে লিখে রাখি। লিখে না রাখলে মাইকে বলার সময় ভুলে যাবো। বলো। এমপি সাহেব পকেটে থেকে কাগজ কলম বের করেন। চশমা বের করে চোখে দেন।
-ওর নাম সেলিম।
-কী?
-সেলিম। বাবার নাম আব্দুল হালিম।
-আর বলতে হবে না। দুঃখিত জনি, আমি ওর জন্যে কিছু করতে পারবো না।
-মানে?
-মানে ওর জন্যে আমি কিছু করবো না। সে একটা অমানুষ। এই বয়সেই সে দলবাজি শিখে গেছে। নির্বাচনের সময় সে আমার প্রতিদ্বন্দ্বী জব্বার পাটোয়ারীর নির্বাচন করেছে। তার ভোট হয়নি, কিন্তু সে তার পাড়ার সবাইকে বলেছে আমাকে ভোট না দেওয়ার জন্যে। ঠিকই তারা আমাকে ভোট দেয়নি। আমি ঐ কেন্দ্র থেকে ফেল করেছিলাম। সে তার দলবল নিয়ে আমার কর্মীদের উপর আক্রমণও করেছিল। এই বয়সেই যে এইসব কাজ করতে পারে, সেতো বড় হলে একটা গুন্ডা হবে। সারা দেশের মানুষকে জ্বালিয়ে মারবে।
-আংকেল, নির্বাচনের সময় মানুষ অনেক কিছুই করে। সে ছোট মানুষ। আপনিই তো বললেন তার এখনও ভোটই হয়নি। সে নিশ্চয়ই অন্য কারো কথায় আপনার বিপক্ষে কাজ করেছিল। এখন তো তার জীবন মরণ সমস্যা। আপনি দয়া করে তাকে ক্ষমা করে দিন। তাকে সাহায্য করুন।
-তার কয়টা অন্যায় আমি ক্ষমা করবো? নির্বাচনের পর যখন তাদের এলাকায় গেলাম, তখন সে কী করল জানো? একদল ছেলে নিয়ে এসে আমার গাড়ির উপর ঢিল ছুড়তে লাগল। আমার গাড়ির গ্লাস ভেঙে গুড়ো হয়ে গেল। একটা ঢিল আমার কপালেও লেগেছিল। আমি আহত হয়েছিলাম। এই অন্যায় কি ক্ষমা করা যায়? আমি এতো মহামানব না যে এতো বড় বড় অন্যায় ক্ষমা করে দেবো। আর সাহায্য? তাকে আমি কেন সাহায্য করবো? যে যার দলের হয়ে আমার উপর আক্রমণ করেছিল, সে সাহায্য করুক। এছাড়া আমার দলে বহু অসহায় লোকজন আছে। যারা জানপ্রাণ দিয়ে আমার নির্বাচন করেছি।। আমি সাহায্য করলে তাদের করবো। তুমি এখন যেতে পারো বাপু। আমি তোমার কোন কথাই রাখতে পারবো না।
এমপি সাহেব উঠে চলে যেতে থাকেন। জনি তার সামনে হাতজোড় করে-আংকেল, সেলিমের উপর একটু দয়া করেন। আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি, সেলিম সুস্থ হয়ে ওঠার পর আমি তাকে বলবো আপনার কাছে এসে আপনার পা ধরে ক্ষমা চাওয়ার জন্যে। তাকে আরো বলব আজীবন যাতে আপনার নির্বাচন করে। দয়া করেন আংকেল। এমপি সাহেব থমথমে গলায় বলেন-আমি এককথার মানুষ। আমি একবার যা বলেছি, তাই হবে। এই ফাজিলের জন্যে আমি কিছু করতে পারবো না। পারলেও করবো না। তুমি যাও। আর কোনদিন এই ধরনের আবদার নিয়ে আমার কাছে আসবে না।
।। চৌদ্দ।।
টিফিন পিরিয়ডে আসগর মিয়ার দোকানে যায় জনি আর জিতু। ট্যারা বাবু তখন বেঞ্চে বসা। সে জনিকে ডেকে তার পাশে বসায়। জিতু দাঁড়িয়ে থাকে। জনি তাকে পরিচয় করিয়ে দেয়। ট্যারা বাবু বলে-পরিচয় করিয়ে দিতে হবে না। আমি ওকে চিনি। তারপর বলো তোমার কী খবর। এমপির কাছে নাকি গিয়েছিলে। ফায়দা নেই। এই বেটা একটা সিমার। মনে কোন দয়া মমতা নেই। নিজের স্বার্থটাই তার কাছে সব। সেলিম যদি তার দলের লোক হতো, তাহলে দেখতে চুরি চামারি করে টাকা পয়সা যোগাড় করে সেলিমের অপারেশন করিয়ে নিয়ে আসত। তার কাছে যাওয়ার আগে আমাকে জিজ্ঞেস করলে পারতে। আমি তোমাকে যেতে নিষেধ করতাম। অযথা নিজেকে ছোট করা।
-এখন কী করা যায় বাবু ভাই?
-আমি এমপির নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জব্বার পাটোয়ারির নির্বাচন করেছিলাম। তার সঙ্গে আমার অত্যন্ত সুসম্পর্ক। তিনি ধনী মানুষ। হৃদয়বান মানুষ। আরো বড় কথা হলো, নির্বাচনের সময় সেলিম তার হয়েই কাজ করেছিল। তার হয়েই এমপির গাড়িতে ঢিল ছুড়েছিল। এমপির লোকজনের উপর আক্রমণ করেছিল। জব্বার সাহেব যদি শোনেন সেলিম অসুস্থ, তাহলে পাঁচ লাখ কেন, দশ লাখ টাকা দান করে দেবেন। তুমি আজকেই তার সঙ্গে দেখা করবে। আমি ফোন করে দেবো।
-ফোন করে দিলে হবে না বাবু ভাই। আপনাকে আমার সঙ্গে যেতে হবে। আপনি গেলে উনি বিষয়টাকে বেশি গুরুত্ব দেবেন।
-আচ্ছা ঠিক আছে, যাবো। বিকেলে রেডি থেকো। আমি বাইক নিয়ে আসবো।
জব্বার পাটোয়ারি বাইরে বের হচ্ছিলেন। গেটের কাছে যেতেই ট্যারা বাবু আর জনির সামনে পড়ে যান। ট্যারা বাবু দুই হাত পেছনে নিয়ে অতি ভদ্রের মত সালাম দেয়। জব্বার সাহেব সালামের জবাব দিয়ে তার দিকে হাত বাড়িয়ে বলেন-আরে বাবু, তুমি? জ্বি ভাই, একটা জরুরী দরকারে এসেছি। দরকারটা কী, সেটা একটু গোপনে বলতে চায় ট্যারা বাবু। তাই সে জব্বার সাহেবকে অনুরোধ করে দেয়ালের ওপাশে যাওয়ার জন্যে। জব্বার সাহেব দেয়ালের ওপাশে গিয়ে ট্যারা বাবুর আসার কারণ জানতে পেরে বলেন-আমি মনে হয় তোমার অনুরোধ রাখতে পারবো না বাবু। আমার সময় ভালো যাচ্ছে না। নিজেই খুব টানাটানির মধ্যে আছি।
-ভাই, আমরা থাকতে আপনার সময় ভালো যাবে না কেন? কী হয়েছে?
-হা হা হা। তোমরা থাকতে আমার সময় ভালো যাবে না কেন, তাই না? হাসালে বাবু, হাসালে। তোমরা থাকলে আমার কী এমন বিরাট উপকার হয়? নির্বাচনে আমাকে পাস করাতে পেরেছো? পারোনি। যদি পারতে, তাহলে আমার সময়ও ভালো যেত, তোমাদের সময়ও ভালো যেত।
-ভাই, নির্বাচনে আপনি খুব অল্প ভোটের ব্যবধানে হেরেছেন। এটা একটা অ্যাক্সিডেন্ট। এরজন্যে ছেলেটাকে একটু হেল্প করবেন না?
-অল্প ভোটে হারি আর বেশি ভোটেই হারি; তোমরা আমাকে জেতাতে পারোনি, এটাই হচ্ছে আসল কথা। তবে আমার টাকা কিন্তু কম খাওনি। তোমাদের চাহিদা পূরণ করতে করতে আমি দেউলিয়া হয়ে গেছি। এখন আবার এসেছো টাকার জন্যে।
-ভাই, নির্বাচন চলে গেছে কতদিন হয়ে গেল। এখন এইসব কথা বলছেন…
-বলতাম না। কোনদিনই বলতাম না। আজকে টাকার জন্যে এসেছো বলেই বলতে হলো। যাক, আমার কথায় তুমি কষ্ট পেয়ে থাকলে আমি সরি। তবে কোন টাকা পয়সা আমি দিতে পারবো না।
-ভাই, যে ছেলেটার জন্যে টাকা চাইতে এসেছি, সে কিন্তু জানপ্রাণ দিয়ে আপনাকে ভালোবাসে। নির্বাচনের সময় সে আপনার জন্যে কী করেনি! একজন ভোটার যা করে না, সে ভোটার না হয়েও তার চেয়ে বেশি করেছে।
-বেশি করে কি আমাকে পাস করাতে পেরেছি? পারেনি। তাহলে এই ‘বেশি’ ধুয়ে আমি কি পানি খাবো?
-ভাই, এইবার না হয় দুর্ভাগ্যবশত আপনি পাস করতে পারেননি। কিন্তু জীবন তো শেষ হয়ে যায়নি। আগামীবার যখন নির্বাচনে দাঁড়াবেন, তখন কিন্তু সেলিমের মত নিবেদিতপ্রাণ একজন কর্মী আপনার দরকার হবে।
-বাবু, কথাটা বললে তুমি হয়তো আমাকে স্বার্থপর ভাববে। তবু বলছি। আসলে যা বাস্তব, তাতো বলতেই হবে। সেলিমের পায়ের যে অবস্থার কথা তুমি বললে, তাতে আগামী নির্বাচনে সে আমাকে সাহায্য করবে কী, সে নিজেই তো অন্য মানুষের সাহায্য ছাড়া উঠে দাঁড়াতে পারবে না। এই অচল, খোঁড়াকে দিয়ে আমি কী করবো?
জব্বার সাহেবের এই কথাগুলোর পর তাকে আর কোন অনুরোধ করার রুচি থাকে না ট্যারা বাবুর। আর জনির রুচি থাকে না তার বাড়ির সীমানায় দাঁড়িয়ে থাকার। কারণ জব্বার সাহেব কথাগুলো একটু দূরে গিয়ে বললেও জনি স্পষ্টই শুনতে পেয়েছে। সে ট্যারা বাবুকে ডাক দিয়ে বলে-আসেন ভাইয়া, চলে যাই। ট্যারা বাবু চলে আসে। তার চোখে মুখে লজ্জার ছাপ। কত বড়মুখ করে সে জনিকে এখানে নিয়ে এসেছিল! অথচ লোকটা তার মুখে চুনকালি মেখে ছেড়ে দিল। ট্যারা বাবু বাইকে উঠে বসে। জনিও ওঠে। জব্বার সাহেব বাইকের পাশ দিয়েই বাইরে যাচ্ছিলেন। ট্যারা বাবু তাকে উদ্দেশ্য করে বলে-আজকের দিনটার কথা মনে থাকবে ভাই। তবে এই দিনই দিন না। দিন আরো আছে। সেদিন ট্যারা বাবুর কাছে আপনার যেতে হতে পারে। গেলাম।
মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে জনি। স্কুলে এসে জিতু ছাড়া আর তেমন কারো সঙ্গেই কথা বলে না। তার শরীরটাও বেশ দুর্বল দেখায়। মনে হয় জ্বর থেকে উঠেছে। আজকের চতুর্থ পিরিয়ডটা অফ। স্যাররা স্কুলের কী একটা সমস্যা নিয়ে যেন জরুরী মিটিংয়ে বসেছেন। জিতু জনিকে ‘ইম্পোর্টেন্ট কথা আছে’ বলে পুকুরপাড়ে নিয়ে যায়। যেখানে এর আগে সে তাকে নিয়ে এসেছিল সুপারি গাছের সঙ্গে তুলনা করার জন্যে। তবে আজ জিতুর মধ্যে দুষ্টুমির কোন লক্ষণ নেই। সত্যি সত্যিই হয়তো কোন ইম্পোর্টেন্ট কথা বলবে। জনি আর জিতু পুকুরপাড়ের সবুজ ঘাসের উপর পাশাপাশি বসে। জিতু বলে-আমি তোর ব্যাপারে কিছু জিনিস জানার জন্যে তোকে এখানে নিয়ে এসেছি। আরো আগেই কথাগুলো জিজ্ঞেস করতে পারতাম। কিন্তু বিভিন্ন কারণে করা হয়নি।
-বল কী জানতে চাস।
-তোর নিজের সম্পর্কে, তোর ফ্যামিলি সম্পর্কে। তোর নিজের সম্পর্কে জানতে চাচ্ছি এই জন্যে, কারণ এতোদিন হয়ে গেল তোর সঙ্গে চলছি ফিরছি, তবু তোকে বুঝতে পারছি না। এই মনে হয় তুই বোকা, এই মনে হয় তুই চালাক, এই মনে হয় তুই অগোছালো, এই মনে হয় গোছালো, এই মনে হয় পড়াশোনার প্রতি মনোযোগী, এই মনে হয় অমনোযোগী, এই মনে হয় মানুষের জন্যে তোর কোন দরদ নেই, এই মনে হয় প্রচন্ড দরদ। এককথায় তুই বহুরূপী। কারণ কী বল তো!
-কোনই কারণ নেই। আমার আসলে যখন যা মন চায়, তাই করি। সব কাজই বুদ্ধি খাটিয়ে করতে চেষ্টা করি। কিন্তু সব জায়গায় চেষ্টাটা কাজে দেয় না। তাই হয়তো আমার কোন কোন কাজ দেখে আমাকে বোকা মনে হতে পারে। আর মানুষের প্রতি দরদের কথা যদি বলিস তাহলে বলবো আমার সব দরদ আমার পরিবারের লোকজনের জন্যে। তবে পরিবারের বাইরের কারো প্রতিও যদি একবার দরদ জন্মে যায়, তাহলে তাকে আমার পরিবারের লোকজনের মতই আপন করে নিই। আর পড়াশোনার প্রতি একদমই আমার মনোযোগ নেই। না পড়লে মা বকাবকি করেন, স্যাররা বকাবকি করেন, তাই একটু আধটু পড়ি আরকি। তবে আমার ব্যাপারে যদি এক কথায় জানতে চাস তাহলে বলতে পারি-আমি একটা খামখেয়ালি প্রজাতির মানুষ।
-এইবার তোর ফ্যামিলি সম্পর্কে বল।
-আজকে না। আরেকদিন বলি। আজকে আর কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। চল, ক্লাসের দিকে যাই।
।। পনের।।
আজ জনি নিজেই জিতুকে পুকুরপাড়ে নিয়ে যায়। কথাও শুরু করে নিজের আগ্রহে-আমার ফ্যামিলি সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলি। আমরা দুই ভাই, এক বোন। সবার বড় ভাই, তারপর বোন, সবার ছোট আমি। ভাইয়া চাকরি করে। আপু ভর্সিটিতে পড়ে। হোস্টেলে থাকে। তবে আমাদের আরেকটা ভাই ছিল। আপুর ছোট, আমার বড়। আমার জন্মের আগেই সে রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছে। একজনকে হারিয়ে আরেকজনকে পেয়েছে বলে আমার প্রতি সবসময়ই সবার একটু বাড়তি ভালোবাসা ছিল। এই বাড়তি ভালোবাসা পেয়েছি বলেই হয়তো আমি খামখেয়ালি হয়েছি। তবে আমাকে একটু শাসন করলে ভাইয়াই করেন। আর কেউ তেমন কিছু বলে না।
-এখানে তোরা থাকিস কোথায়?
-ভাড়া বাসায়। আমি ঘনঘন স্কুল চেঞ্জ করি, তাই আব্বু কোথাও বাড়ি বানান না। তবে যেহেতু আমার বদভ্যাস দূর হয়েছে, এখন হয়তো বানানোর চিন্তা ভাবনা করবেন। আব্বু চাকরি করেন পাশের জেলায়। প্রতি সপ্তাহেই বাড়ি আসেন। ছুটিছাটা থাকলে তো আসেনই। কোন কোন সময় বাড়ি থেকে গিয়েও অফিস করেন। জিতু!
-জ্বি?
-তুই মনে হয় একটু নিরাশ হলি।
-নিরাশ হয়েছি!! কেন বল তো?
-তুই নিশ্চয়ই ভেবেছিলি আমার সম্পর্কে, আমার ফ্যামিলি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে অনেক ইন্টারেস্টিং বিষয় আশয় জানতে পারবি। কিন্তু ইন্টারেস্টিং কিছুই পেলি না। অন্য দশটা সাধারণ ছেলের মতই আমি। অন্য দশটা সাধারণ ফ্যামিলির মতই আমার ফ্যামিলি। এই যে এতো আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করার পর ইন্টারেস্টিং কিছুই পেলি না, এরজন্যে আফসোস তো নিশ্চয়ই হচ্ছে। হচ্ছে না?
জিতু কপাল কুঁচকে বলে-‘আফসোস’, ‘নিরাশ’ এইসব কথা কেন আসছে বুঝতে পারছি না তো! একসাথে পড়ি, তোর ব্যাপারে আমি জিজ্ঞেস করতে পারি না? আসলে তোর ব্যাপারে আমার মনে বেশি কৌতূহল তৈরি হয়েছিল সেলিমের ব্যাপারটার কারণে। আমি অনেককেই দেখেছি। এইসব ব্যাপার এড়িয়ে যায়। এগুলোর সঙ্গে জড়াতে চায় না। অথচ তুই বারবার ব্যর্থ হয়েও আবার নতুন করে চেষ্টা করছিস। সেলিম সুস্থ হওয়ার পর জানি না তোকে মনে রাখবে কি না। তবে তুই যে তাকে নতুন জীবন দিয়েছিস, এটা তাকে আজীবন স্বীকার করতে হবে। জনি বলে-তুই এমনভাবে বলছিস, যেন সেলিমের অপারেশন হয়ে গেছে। এতো অ্যাডভান্স কথা বলিস না তো! এখনও একটা টাকা যোগাড় হয়নি, তুই আছিস স্বীকার করা নিয়ে।
আজ সাপ্তাহিক ছুটি। জনির বাবা বাড়ি এসেছেন। রাতে জনি বাবার সঙ্গে খাওয়া দাওয়া করার পর বিছানায় শুয়ে একটু রেস্ট নিচ্ছিল। এমন সময় মা ঢুকলেন ঘরে। তিনি বাবার মোবাইলটা জনির দিকে এগিয়ে দিয়ে বলেন-কে জানি তোকে চাচ্ছে। কী যেন নাম বলল…। জনি মোবাইল কানে চেপে ধরতেই শাহেদ ভাইয়ের কণ্ঠ শুনতে পায়। শাহেদ ভাই কথা শুরুই করেন অভিযোগ দিয়ে-তোমাকে তো মিয়া পাওয়ার কোন ওয়ে-ই নেই। কখন তোমার আব্বু বাসায় থাকবেন, সেই হিসেব করে ফোন দিতে হয়। উনার মোবাইলের উপর ভরসা করে বসে না থেকে আরেকটা মোবাইল কিনতে পারো না? মোবাইল কিনতে আর কয় টাকাই বা লাগে?
-টাকা পয়সার বিষয় না শাহেদ ভাই। আপনি তো জানেন আমি ভাইয়াকে খুব ভয় পাই। ভাইয়া বলেছেন আমাকে যাতে এসএসসি পাসের আগে মোবাইল কিনে না দেওয়া হয়। তবে আমি ভাইয়াকে অনুরোধ করলে হয়তো ভাইয়া তার কথা ফিরিয়ে নেবেন। কিন্তু আমারই মোবাইল ইউজ করার শখ নেই। মোবাইল আমার কাছে ঝামেলা মনে হয়।
-তাই বলে তোমাদের বাড়িতে একটা মোবাইল থাকবে না?
-আপনাকে বলা হয়নি। আম্মুরও কিন্তু একটা মোবাইল আছে। কিন্তু আম্মু অপরিচিত কাউকে নাম্বার দিতে নিষেধ করেছেন। আপনি তো কোনদিন আমাদের বাড়িতে আসলেন না। একদিন এসে আম্মুর সাথে পরিচিত হন। তখন আম্মুই আপনাকে তার নাম্বার দিয়ে দেবে।
শাহেদ ভাই জিজ্ঞেস করেন-এখন আসবো? নাকি সকালে আসবো? জনি অবাক হয়-মানে? শাহেদ ভাই হাসেন-অবাক হওয়ার কিছু নেই। আমি এখন তোমাদের এলাকায়। একটু আগে আসলাম। খুব টায়ার্ড। শুয়ে আছি। মাথাটাও একটু ধরা। জনি উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে-তাহলে আমি খুব সকালে আপনার এখানে আসবো। এতো সকালে ঘুম থেকে উঠতে হয়তো আপনার কষ্ট হবে। তবু আসবো। খুব জরুরী কথা আছে। শাহেদ ভাই অভয় দেন-তুমি যত সকালে আসতে চাও, আসো। তবে ফজরের নামাযের আগে না আসলেই হলো। আর শোনো, আমি কালকেই একবার তোমাদের বাড়িতে আসবো। আন্টির সাথে পরিচিত হবো। তার নাম্বার নেবো। ওকে?
ফজরের আযানের অনেক আগেই ঘুম ভেঙে যায় জনির। সে ছটফট করতে থাকে আর জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতে থাকে। বিদঘুটে অন্ধকার। ফজরের আযানের পরও এই অন্ধকার কাটতে চায় না। সে ঘড়ি ধরে দশ মিনিট অপেক্ষা করে। তারপর বেরিয়ে পড়ে ঘর থেকে। শাহেদ ভাইয়ের আত্মীয়ের বাড়ি এসে দেখে তিনি বারান্দায় বসে পত্রিকা পড়ছেন। আগের দিনের পত্রিকা। শাহেদ ভাই জনিকে বসতে দেন। জনি সংক্ষেপে কুশল বিনিময় সেরেই সেলিমের কথা বলে। তার কাছে সাহায্য এবং পরামর্শ চায়। শাহেদ ভাই বলেন-আমি ওর জন্যে কী করতে পারবো জানি না। তবে চেষ্টার ত্রুটি করবো না। তার আগে ওকে আমি সরাসরি দেখতে চাই। কোন হাসপাতাল যেন?
শাহেদ ভাইকে হাসপাতালের নাম বললেও তাকে একা যেতে দেয় না জনি। সে সাথে যায়। সেলিমকে দেখে চোখ ছলছল করে ওঠে দুজনেরই। মানুষ তো নয়, যেন একটা কঙ্কাল শুয়ে আছে। সেলিমের মা বসে আছেন সেলিমের পায়ের কাছে। তার চোখ শুকনো। কাঁদতে কাঁদতে হয়তো এখন চোখের পানি ফুরিয়ে গেছে। জনি সেলিমকে আজ আর জিজ্ঞেস করে না কেমন আছে। জিজ্ঞেস করে আর কী হবে। কেমন আছে, তাতো সে নিজ চোখেই দেখতে পাচ্ছে। এছাড়া কথা রাখতে না পারার লজ্জা তো তাকে তাড়া করে ফিরছেই। সে যদি তার কথা রাখতে পারত, তাহলে এতোদিনে সেলিমের অপারেশন হয়ে যেত। ছিঃ সেলিম মনে মনে কী ভাবছে! সে কি তার অক্ষমতা স্বীকার করে সেলিমের কাছে মাফ চেয়ে নেবে? কিন্তু মাফ চাইলেই কি সব মাফ হয়ে যাবে?
গর্তে ঢুকে যাওয়া সেলিমের চোখ দুটোর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকেন শাহেদ ভাই। তারপর তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন-আজ যাই। পরে দেখা হবে। রুম থেকে বের হয়ে যান শাহেদ ভাই। জনিও তার পিছু পিছু বের হয়ে যায়। বের হওয়ার আগে সেলিমের কাছ থেকে বিদায়ও নেয় না। শাহেদ ভাই রাস্তার পাশের একটা চা স্টলে বসেন। জনি তার ডান পাশে বসে। শাহেদ ভাই চায়ের অর্ডার দিয়ে পকেট থেকে মোবাইল বের করেন। তারপর একটা নাম্বার ডায়াল করে বেঞ্চ থেকে উঠে দোকানের পেছনের নিরিবিলি জায়গায় চলে যান। প্রায় সাত আট মিনিট কথা বলেন। কার সাথে কথা বলেন, কী কথা বলেন-কিছুই শোনা বা বোঝা যায় না।
কথা বলা শেষ হলে মোবাইলটা আগের জায়গায় রাখতে রাখতে জনির সামনে এসে দাঁড়ান শাহেদ ভাই। চায়ের কাপটা হাতে তুলে নিয়ে বলেন-দুনিয়াটা বড় কঠিন জায়গা জনি। এখানে কেউ কাউকে সাহায্য করতে চায় না। এমপি সাহেব আর জব্বার সাহেবের কাছে সাহায্যের জন্যে গিয়ে নিশ্চয়ই তুমি সেটা কিছুটা বুঝতে পেরেছো। তাই বলে হাল ছেড়ে দিলেও চলবে না। চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। আমি খুবই ক্ষুদ্র একটা মানুষ জনি। আমার ক্ষমতাও খুবই ক্ষুদ্র। তবু আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো সেলিমের অপরেশনের টাকাটার একটা ব্যবস্থা করে দিতে। পারবো কিনা বলা কঠিন। যদি নাও পারি, মনে করবে তোমার এই শাহেদ ভাইয়ের আন্তরিকতার কোন কমতি ছিল না।

চলবে…..

দয়াকরে লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০১৮-২০১৯ নবরঙ
Design BY NewsTheme