লেখা আহবান
প্রিয় লেখক বন্ধু, আপনার লেখা সবচেয়ে সুন্দর উপন্যাস, সায়েন্স ফিকশন, ভ্রমণকাহিনী, ফিচার, স্বাস্থ্য কথা ইত্যাদি পাঠিয়ে দিন এই মেইলে– noborongpotrika@gmail.com
ভোর রাতের স্বপ্ন

ভোর রাতের স্বপ্ন

সাঞ্জিদা মেহের সাঞ্জু

আমি স্বভাবত খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠিনা। সারারাত সাদাফের সাথে ফেসবুকিং কিংবা কখনো ভিডিও কলিং করে ভোরে ঘুম দেই। সেই ঘুম ভাঙতে ভাঙতে দুপুর একটা কিংবা দুইটা বেজে যায়। মা তার মতো আমাকে ডাকতেই থাকেন আর আমি ঘুমের রাজ্যে জয় করতে থাকি।

আগে অবশ্য এমনটা ছিলোনা। ইন্টার পরীক্ষা দেবার পর থেকেই এ নিয়ম চালু হয়েছে, নিয়মটা আমিই চালু করেছি। দীর্ঘ দুইবছর একটানা পড়ার পর এতটুকু পরিবর্তন নিজের মধ্যে আনাই যায়, এটা দোষের কিছুনা।

আজ কি মনে করে যেনো ভোরবেলা ঘুম ভেঙে গেলো বুঝতেই পারলাম না। অনেক চেষ্টা করেও চোখ বুজতে পারলামনা, বিছানাটা কেমন অসহ্য মনে হচ্ছিলো। বারান্দায় উঁকি দিতেই বুঝতে পারলাম এখনো ভোরের আকাশে সূর্য্যের দেখা মেলেনি। বালিশের পাশ থেকে মোবাইলটা নিয়ে সময়টা দেখলাম, সবে মাত্র চারটা! ডাটাটা অন করে ফেসবুকে ঢুঁ মারতেই সব ফাঁকা। পরিচিত যাঁদের সাথে কথা হয় তারা কেউই এক্টিভ নেই। নিশ্চয় সাদাফটা মরার মতো ঘুমোচ্ছে। তাই আর বিরক্ত করলামনা। পাশের রুমে উঁকি দিলাম মা এখনো ঘুমোচ্ছেন।

রুমে এসে বিছানায় ধপ করে বসে পড়লাম। ঘুমিয়েছি মাত্র এক ঘণ্টা আগে এর মধ্যেই ঘুম ভেঙে যাওয়ার কোনো যথাযথ কারণ খুঁজে পেলাম না। মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করছে। শরৎচন্দ্রের দেবদাস বইটা হাতে নিয়ে পড়তে শুরু করলাম। এর আগেও একবার পড়েছি, তারপরও অন্য বই হাতে নিতে ইচ্ছে হলোনা। দুই তিন পাতা পড়ার পর বইটা ছুড়ে ফেলে দিতে ইচ্ছে হলো। চারদিকটা কেমন বিষাদ বিষাদ লাগছে।

খানিক সময় রুমে পায়চারি করার পর বারান্দায় চেয়ার নিয়ে বসে পড়লাম। চারদিকে আযানের সুর ভেসে বেড়াতে শুরু করলো। প্রথমে খুব আস্তে করে একটা সুর, তারপর দুই তিন দিক থেকে, আস্তে আস্তে অনেক গুলো মসজিদ থেকে সুর ভেসে আসতে লাগলো। সুরগুলো কেমন যেনো মোহনীয় লাগছে। খুব মন দিয়ে সুরগুলো অনুভব করতে লাগলাম, মনের তিক্তভাব কিছুটা কমেছে। শরীর খুব নিস্তেজ লাগছে। সেই সাথে মাঝেমাঝে তীব্র ঝাঁকুনি! আযান শেষ হতেই রুমে চলে আসলাম, ধপ করে বিছানায় বসতেই কেমন তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়লাম। একবার ভাবলাম নামাযটা পড়ে ফেলি কিন্তু ঘুম ঘুম ভাব হওয়াতে সে সিদ্ধান্তটা বাদ দিলাম।

বেশ লাগছে এখন, বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই চোখটা লেগে এলো। নিজেকে এক অন্য জায়গায় আবিষ্কার করলাম। মখমলের গালিচার উপর দিয়ে হেটে সামনে এগোচ্ছি। যতটা পথ সামনে চোখ যায় শুধু ফুল আর ফুল, এত সৌরভ ফুলের তা আগে কখনো জানা ছিলোনা আমার। পাশের বাসাতেই হাসনাহেনা,গন্ধরাজ আরো নাম না জানা অনেক সুন্দর সুন্দর ঘ্রাণের ফুল গাছ আছে। সারা বছরই কোনো না কোনো ফুল ফুটতে থাকে আর ঘ্রাণে পুরো এলাকা যেনো মৌ মৌ করতে থাকে। কিন্তু এখানকার ফুলের ঘ্রাণটা একেবারে আলাদা, এক কথায় বলাযায় বর্ণনাতীত! কিছুটা সামনে এগোতেই এক বিশাল রাজপ্রাসাদ, তবেঁ তা সাধারণত দেখতে যেমন রাজপ্রাসাদ তেমন নয়। হিরে জহরত, মনি মুক্তোদানা যেনো চকচক করে ফুটে উঠছে পুরো প্রাসাদজুড়ে। ঠিক রুপকথায় যেমন প্রসাদের বর্ণনা করা হয় তার চেয়েও অনেক বেশী অন্যরকম। ভাষায় প্রকাশ করার মতো না এত সুন্দর দেখতে!

প্রাসাদের দুই পাশেই স্বচ্ছ পানির ঝর্না। ইচ্ছে হচ্ছিলো এক দৌড়ে চলে যাই ঝর্ণার কাছে। নিজেকে উজাড় করে সারাটা সময় কাটিয়ে দেই ঝর্ণার জলধারার সাথে। কেমন অদ্ভুত সুন্দর সবকিছু। মাশাআল্লাহ! ভাবতে ভাবতে আর সবটা দেখতে দেখতে একেবারে প্রসাদের সামনে চলে এলাম। এত বড় প্রাসাদ অথচ আমার কোনো ভয় হচ্ছেনা, কোনো সংকোচ হচ্ছেনা প্রাসাদের ভিতরে যেতে। অথচ সকল সময় আমি আম্মুর সাথে চলাফেরা করে এসেছি, একা কখনো বেরও হতামনা। খুব বেশী ভয় কাজ করতো আমার মধ্যে। আর এখানে কেউ নেই, কেউ না? সবটা জুড়েই এক লোভনীয় পরিবেশ তার সাথে আমি একা। সম্পূর্ণ একা!

প্রাসাদের ভিতরে প্রবেশ করার পথেই দুটো ছোট ছোট বাচ্চা দেখতে পেলাম। আপনমনে পুতুল নিয়ে খেলা করছে। মাঝেমাঝে একজন আরেকজনকে হাসিমুখে সালাম দিচ্ছে, কুশল বিনিময় করছে। কিন্তু অপরজন সালাম নিচ্ছেনা বরঞ্চ মুখ ভার করে রেখেছে। সালামের শব্দ শুনে একটু মুখ তুলে তাকাচ্ছে শুধু। তারপর আবার নিজ নিজ পুতুল নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে। মনে হচ্ছে নিজেদের মধ্যে কোনো প্রতিযোগিতা হয়েছিলো, যে প্রতিযোগিতায় বারবার সালাম দেয়া পিচ্চিটা জিতে যাচ্ছে। মুখভর্তি তার হাসি যেনো লেপ্টে আছে। অনিন্দ্য সুন্দর কোনো দৃশ্য বুঝি একেই বলে। যদি কোনো সৌন্দর্যের কবি এঁদের এভাবে দেখতো নির্ঘাত কয়েকখানা কবিতা-গল্প নিমিষেই লিখে ফেলতো! আমি ওদের সামনে যেতেই দুজনই আমার মুখের দিকে তাকালো, মিষ্টি করে একটা সালাম দিলো সেই পিচ্চিটা। অপর পিচ্চি আমার দিকে ক্রোধের চোখে তাকিয়ে কেমন যেনো হতাশা বোধ করতে লাগলো। সালামের উত্তর নিতে না নিতেই পিচ্চিটা জিজ্ঞেস করলো কেমন আছেন? আমিও মিষ্টি হেসে উত্তর দিলাম আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি তোমরা? পিচ্চিটাও আলহামদুলিল্লাহ বললো। তারপর কিছু বলার আগে হাতের ইশারা দিয়ে দেখালো প্রাসাদের দরজার ওপাশের সবুজ গালিচা। এরপর তারা আবার নিজ পুতুলকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেলো। শুভ্র সতেজ শিশিরযুক্ত ঘাস যেমন নমনীয় হয়, গালিচা দেখতে তার চেয়েও বেশি সুন্দর! সেদিকে ভালোকরে তাকাতেই দেখতে পেলাম সাড়ি সাড়ি জায়নামাজ বিছানো। আরকিছু দেখার আগেই ঘুম ভেঙে গেলো। মোবাইল হাতে নিয়ে দেখলাম সবে পাঁচটা! বুঝতে বাকি রইলোনা এই স্বপ্ন কিসের ইঙ্গিত দিচ্ছে!

এবার আর শুয়ে না থেকে সোজা ওয়াশরুমে চলে গেলাম। ফ্রেশ হয়ে ওযু করে নিলাম। এসেই মায়ের ঘরে চলে গেলাম, মা জায়নামাযে বসে নামাজ পড়ছেন। আমিও তার পাশে আরেকটা জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজ পড়া শুরু করে দিলাম। মনে মনে নিয়ত করে নিলাম জীবনে যেমন পরিস্থিতি আসুক নিজ ইচ্ছায় কখনো এক ওয়াক্ত নামাজ কাজা করবোনা, ইনশাআল্লাহ।

কিছু কিছু স্বপ্ন জীবনের মোড় একেবারে পাল্টে দেয়। যেমনটা পাল্টে দিলো আদিয়ার জীবন! সেদিনের পর থেকে আদিয়া অনেকটা বদলে গেলো, ইসলামি নীতিতে তার জীবন পরিচালনা করতে শুরু করলো। বড় বড় আলেমা আপুদের সহচার্যে থাকার চেষ্টা করতো খুব। সাদাফকেও বলে দিয়েছিলো বিয়ের আগে আর তাদের কোনো দেখা বা কথা হবেনা। সাদাফও সবটা মেনেনিয়ে আল্লাহর কাছে তওবা করে নতুন করে জীবন শুরু করেছে! ওরা ওদের জীবনকে বদলে দিতে পারলে আপনি আমি কেনো পারবোনা? আল্লাহ সবাইকে মাফ করুন, এবং সবকিছু বুঝার তৌফিক দান করুন। আমিন।

মুন্সিগঞ্জ সদর

দয়াকরে লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০১৮-২০১৯ নবরঙ
Design BY NewsTheme