লেখা আহবান
প্রিয় লেখক বন্ধু, আপনার লেখা সবচেয়ে সুন্দর উপন্যাস, সায়েন্স ফিকশন, ভ্রমণকাহিনী, ফিচার, স্বাস্থ্য কথা ইত্যাদি পাঠিয়ে দিন এই মেইলে– noborongpotrika@gmail.com
বাংলাবানান ও শব্দগঠনঃ ভুল শুধু ভুল

বাংলাবানান ও শব্দগঠনঃ ভুল শুধু ভুল

শাহ আলম বাদশা

চতুর্থ পর্ব

গ্রহণ/গ্রহণ করা/অংশগ্রহণ/­ব্যবস্থাগ্রহণ/­পদক্ষেপগ্রহন/­শ্বাসগ্রহণ/শপথগ্রহণ ইত্যাদি আমরা গ্রহণ করা ক্রিয়াপদটির ব্যবহারে কত যে ভুল করি, যার ইংরেজি প্রতিশব্দ হচ্ছে-Take/Accept। যেমন আমরা বলি-আমি তোমার বাসায় কিছুতেই পানিগ্রহণ করবো না, আমি কিছুতেই তোমার টাকাগ্রহণ করতে পারবো না। এ দু’বাক্যে কী ফারাক বুঝলেন? বিশাল ফারাক আছে দু’টো বাক্যের মাঝে; Take/Accept অর্থে টাকাগ্রহণ (টাকাকে গ্রহণ-সমাস) করতে পারবো না, ঠিক থাকলেও কিন্তু পানিগ্রহণ সেই অর্থে ঠিক থাকেনি। এখানে পানিগ্রহণ (জলস্পর্শ) পান করা অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। পানি ও গ্রহণ এ দুটো আলাদা শব্দ মিলেই একশব্দ গঠিত হয়েছে, যার আলাদা অর্থের ব্যাখ্যা হবে এমন-”জমজমের হোক বা অন্যকোনো পানযোগ্য বোতলের বা মগের পানিই হোক আমি তা পান করবোনা।’

আবার পাণিগ্রহণ অর্থ হচ্ছে বিবাহবন্ধন; ণ-দিয়ে পানি বানানটি লিখতে গেলেই কী বিপত্তি ঘটবে, বলুনতো? ঠিক একই রকম অর্থেই ব্যবহৃত অংশগ্রহণ/­ব্যবস্থাগ্রহণ/­পদক্ষেপগ্রহন/­শ্বাসগ্রহণ/শপথগ্রহণ ইত্যাদিও ক্রিয়াবাচক শব্দ। যেমন আমি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ(যোগদান) (অংশকে গ্রহণ নয়) করবো না, আমি কোনো ব্যবস্থাগ্রহণ (পদক্ষেপ নেয়া কিন্তু ব্যবস্থা গ্রহণ নয়) করছিনা। তেমনই জোরে জোরে শ্বাসগ্রহণ (শ্বাসকে গ্রহণ কিন্তু শ্বাস গ্রহণ নয়) করোতো? ”আমি শপথগ্রহণ (শপথ গ্রহণ নয়) করে বলছি যে–।” দেখুন উল্লেখিত শব্দগঠনে জোড়ালাগানো আর স্পেস দেয়াতে কী ধরণের অর্থের ভিন্নতা দেখা দিচ্ছে? সুতরাং দুটো শব্দ একত্র হয়ে ভিন্নার্থগ্রহণ (ভিন্নার্থকে গ্রহণ) করলে তা কখনোই পৃথক করা যাবেনা বা উচিৎ নয়। যেমনঃ অংশগ্রহণ করা মানে Take part আর Share বা কিছুর ভাগ নেয়া মানে অংশ গ্রহন (অংশকে গ্রহন-সমাস) করা। আর ব্যবস্থাগ্রহণ করা মানে Take action. আবার ব্যবহার ও অর্থভিন্নতা দেখুন-”দাঁড়াও তোমার ব্যবস্থা আমিই গ্রহণ করছি!

”বাড়ী/শাড়ী/গাড়ী এবং সরকারী/সরকারি বানানের ক্ষেত্রে বাংলাএকাডেমি’র প্রমিতবানানের সাথে অনেকক্ষেত্রেই আমি একমত নই। যেমনঃ সরকারী বানানটা আগে থেকেই প্রচলিত ছিলো। কিন্তু এখন সরকারী/সরকারি দুটো বানান সঠিক হলেও দুটোর ব্যবহারক্ষেত্র ও অর্থভিন্নতাও তৈরি করা হয়েছে, যা দ্বন্দ্ব ও বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে।

আবার বাড়ী/শাড়ী/গাড়ী ইত্যাদির ঈ-কার তুলে দিয়ে ই-কার বসিয়ে একটাই অবয়ব বা রূপতৈরি (রূপকে তৈরি) করা হয়েছে, যা আমি পছন্দ করলেও বৃহত্তর স্বার্থে এসবেরই ই-কার দিয়ে অপর বানানটিও আমি সমর্থন করি। কারণ এসব শব্দের দ্বৈতবানান থাকলে ভুললেখার সম্ভাবনা কমে যাবে। যেকেউ (যে কেউ নয়) দুটো বানানের একটি লিখলেই তা শুদ্ধ হবে ।

১৯৯২ সালের আগের বইগুলোর কী হবে?
আগের বা পুরনো বানানে আমার শতশত ছড়া-কবিতা-গল্প-প্রব­ন্ধ প্রিন্টেড আকারে ১৯৭৭ সাল থেকে সংরক্ষিত আছে। সন্তানরা তা পড়তে গিয়ে এসব বানান ও শব্দের বিভ্রান্তিতে পড়ে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে নানারকম প্রশ্ন করে তটস্থ করে তোলে। আমি জবাব দিতে গিয়ে প্রায়ই হিমশিম খাই আরকি? আমরা অনেক বড়বড় (বড় বড় নয়, যেমন-সরসর, দরদর) একাধিক শব্দসহযোগে গঠিত শব্দ সহজেই মেনে নিলেও তুলনামুলক অনুরূপ ছোটশব্দকেও অযথা ভাগ করে অর্থই বিগড়ে দেই–ফলে উকিলের ব্যাখ্যার মারপ্যাঁচে পড়ে আইন-আদালতেও হেরে যাবার সম্ভাবনা ১০০% থাকে। যেমন ৩ শব্দের মিলিত শব্দ হচ্ছে-ধর্মনিরপেক্ষতা­বাদ শব্দটি সঠিক লিখলেও ব্যবসায় খাত=ব্যবসায়খাত(ব্যবস­ায়ের খাত)/জাল ভোট=জালভোট (জাল যে ভোট)/দর পতন=দরপতন(দরের পতন)/­সরকার পতন=সরকারপতন(সরকারের পতন)/­অন্ধ সমর্থন=অন্ধসমর্থন(অন্ধ যে সমর্থন)/­পুলিশ প্রহরা=পুলিশপ্রহরা(পুলিশের প্রহরা)/­আরব জাগরণ=আরবজাগরণ(আরবের জাগরণ)/যুগ যুগ=যুগযুগ(যুগের পর যুগ)/দিন দিন=দিনদিন(দিনের পর দিন)/পর পর=পরপর/­দল, ম্‌ত, বর্ণ ও‌ পেশাকে নির্বিশেষে (দলমতবর্ণপেশানির্বিশেষে) ইত্যাদি বড়শব্দকে উপর্যুক্ত পদ্ধতিতে ২/৩/৪/৫ ভাগ করে লিখি, যা ভুল-মহাভুল।

বাংলাভাষার লেখ্যরূপ কঠিন হলেও এটি কিন্তু মজার ও পরিপূর্ণভাষা। আমি যখন আরবীর পাশাপাশি উর্দু পড়েছি তখন দেখেছি–আরবীতে আলিফ, বা, তা, ছা (যদিও শিখেছিলাম আলিফ, বে, তে, ছে ভুলউচ্চারণে) থাকলেও উর্দুতে ছিলো অতিরিক্ত পে, টে, চে ইত্যাদি বর্ণ। ফলে আরবীতে পে বা প জাতীয় বর্ণ না থাকায় পাকিস্তানকে পড়তাম বাকিস্তান বলে। আরবীর এমন অসম্পূর্ণতা রয়েই গেছে যদিও বাংলায় সে সমস্যাতো নেই-ই বরং অতিরিক্ত বর্ণের দাপটে আমাদের মরণদশা আরকি? শ, ষ, স/ড়, ঢ়, র/জ, য, ঝ/ন, ণ ইত্যাদি সমগোত্রীয় বর্ণকে আমরা ঝামেলা মনে করলেও এরা যে, বাংলাকে পৃথিবীর মধ্যে একমাত্র পূর্ণাঙ্গভাষায় পরিণত করেছে, তাকি জানেন! ইংরেজিতে বানানের মুলঅক্ষর বা স্বরবর্ণ হচ্ছে ৫টি যথা- A, E, I, O, U যা দিয়ে সববানান ও উচ্চারণ পরিস্কার হয়না। কিন্তু বাংলায় সে সমস্যা নেই একদম।

এবার আমার অনেক পুরনো একটা কবিতা পড়ুন এবং বানান দেখুন, যেখানে কিছুবানানের ভিন্নতা পাবেনঃ

তিনপিঁপড়ে

তিনপিঁপড়ে কোথায় যেন যাচ্ছিল
সামনে কিসের জলগড়িয়ে আসছিল
তাই দেখে যেই পাশকাটাতে চাচ্ছিল
নাপেরে হায় হাবুডুবুই খাচ্ছিল!

বন্যাতো নয় অজুর পানি গড়ছিল—
সেই পানিতেই খাচ্ছিখাবি করছিল;
বাঁচার জন্য প্রাণপণে যে লড়ছিল
বিফলতায় চোখের পানি ঝরছিল।

অজুর জলে ভেসে ভেসেই চলছিল—
জানের ভয়ে দোয়াও কত বলছিল;
আর নিজেদের কানগুলো যে মলছিল
কারণ ওদের মায়ের কথাই ফলছিল?

মায়ের বারণ তখন কি আর মানছিল
তাই যে বিপদ পদে পদেই টানছিল
এমন ব্যাপার ঘটবে তাকি জানছিল
শিক্ষাপেয়ে কীযে ভীষণ কানছিল।

কান্নাকাটির একটা সীমা-শেষ ছিল
আল্লাহতালার করুণারও লেশ ছিল!
হঠাৎ যে এক শুকনোপাতা ঘেঁষছিল
ওতে চড়েই বাঁচলো দারুণ, কেস ছিল!!

দয়াকরে লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০১৮-২০১৯ নবরঙ
Design BY NewsTheme