লেখা আহবান
প্রিয় লেখক বন্ধু, আপনার লেখা সবচেয়ে সুন্দর উপন্যাস, সায়েন্স ফিকশন, ভ্রমণকাহিনী, ফিচার, স্বাস্থ্য কথা ইত্যাদি পাঠিয়ে দিন এই মেইলে– noborongpotrika@gmail.com
লম্বু জনি- (পর্ব- ৯ থেকে ১২)

লম্বু জনি- (পর্ব- ৯ থেকে ১২)

ইকবাল খন্দকার

পর্ব- নয়

পরদিন সময়মতই স্কুলে আসে জনি। তার হাতে ব্যান্ডেজ, পায়ে ব্যান্ডেজ, মাথায় ব্যান্ডেজ। তাকে দেখে হাসি চেপে রাখতে পারে না জিতুরা। রবিন বলে-কনসার্টে শোয়ার কিছুক্ষণ পরেই তুই ঘুমিয়ে পড়েছিলি শুনেছি। কিন্তু শুয়ে স্বপ্ন দেখেছিলি কিনা, তা কিন্তু শুনিনি। এখন যদি একটু বলিস আরকি। জনি বেঞ্চে বসতে বসতে বলে-আমি স্বপ্নবাজ মানুষ। স্বপ্ন তো অবশ্যই দেখেছিলাম। দেখি আমি একটা নদীরপাড়ে শুয়ে আছি। শুয়ে শুয়ে নদীর কলকল শব্দ শুনছি। পাখির গান শুনছি। রাখালের বাঁশির সুর শুনছি। নদীরপাড়ে কয়েকটা তালগাছ। সবগুলো গাছেই পাকা পাকা তাল। আমি তালগুলো দেখছি। হঠাৎ ধুপধাপ করে আমার উপর তাল পড়তে লাগল। তাকিয়ে দেখি তাল তো না, মানুষের পা পড়ছে আমার উপর।
হাসতে হাসতে পুরো ক্লাসরুম মাথায় তুলে ফেলল জিতুরা। স্যার হয়তো আরো কিছুক্ষণ পর ক্লাসে আসতেন। কিন্তু হাসির শব্দ শুনে আগেভাগেই চলে এলেন। তাই জনিকে আর খোঁচানোর সুযোগ পেল না জিতুরা। ক্লাস শেষে স্যার চলে যেতেই আবার তারা তাকে ঘিরে ধরল। এসময় মনির এসে বলল মনসুর স্যার জনিকে ডাকছেন। জনির মুখ ঘোলাটে হয়ে গেল। এখন মনসুর স্যারের কাছে যাওয়া মানেই বিপদে পড়া। ভরা অফিসে দাঁড়িয়ে সব স্যারের সামনে ঘটনার বিশদ বিবরণ দিতে হবে। তাদের বকাবকি সহ্য করতে হবে। জনির যদি পালানোর অভ্যাসটা এখনও থাকতো, তাহলে আজ তার পালানো কেউ ঠেকাতে পারত না। যেহেতু অভ্যাসটা নেই, অতএব সে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে যায় অফিসের দিকে।
অফিসরুমের দরজা পর্যন্ত যাওয়ার আগেই মনসুর স্যারের দেখা পেয়ে যায় জনি। স্যার অফিস থেকে বের হয়ে এদিকটায় আসছিলেন। জনি দারুণ বাঁচা বেঁচে যায়। কারণ তাকে অন্যান্য স্যারদের সামনে পড়তে হচ্ছে না। কিন্তু স্যার যখন মুখ খোলেন, তখন সে বুঝতে পারে আসলে সে বেঁচে যায়নি। বরং স্যার এগিয়ে এসেছেন তাকে অন্যান্য স্যারদের সামনে নিয়ে যাওয়ার জন্যে। মনসুর স্যার জনির গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বলেন-তোমার জন্যে সবাই অপেক্ষা করছে। কেউ কেউ তো ক্লাস বাদ দিয়ে বসে আছে তোমাকে দেখার জন্যে। চলো। স্যার হয়তো সন্দেহ করছেন, যেকোন সময় জনি ঝেড়ে দৌড় দিতে পারে। আর এই জন্যেই তিনি তার গা ঘেষে দাঁড়িয়েছেন। দৌড় দিতে চাইলেই চোর ধরার স্টাইলে ধরে ফেলবেন।
মনসুর স্যার অফিসে ঢোকেন। আর জনি দরজায় দাঁড়িয়ে সবাইকে সালাম দেয়। হেডম্যার সালামের জবাব দিয়ে জনিকে বলেন তার কাছে যাওয়ার জন্যে। জনির হাত পা জমে আসছে। তবু যেতেই হবে। সে গিয়ে হেডস্যারের টেবিলের কোণা বরাবর দাঁড়ায়। হেডস্যার জিজ্ঞেস করলেন-এই ঘটনা ঘটালে কবে? জনি বলল-স্যার, গতকাল। কলেজ মাঠে কনসার্ট দেখতে গিয়ে। হেডস্যার হাসলেন-আরে বোকা, আমি তোমার অ্যাক্সিডেন্টের কথা জিজ্ঞেস করিনি। গতকাল তুমি কী কান্ড ঘটিয়েছো, এটা আমরা সবাই জানি। আমি বলেছি অন্য ঘটনার কথা। তুমি তো চারদিকে হইচই ফেলে দিয়েছো। এখন পর্যন্ত আমার কাছে কয়টা ফোন এসেছে জানো?
-স্যার আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।
-কিছুই বুঝতে পারছো না?
-না স্যার।
-এই নাও, এটা ভালো করে দেখো। দেখো কিছু বুঝতে পারো কিনা।
স্যার জনির হাতে একটা পেপার ধরিয়ে দেন। পেপারে নিজের ছবি দেখে সে ভুলেই যায় এটা অফিসরুম। ভুলেই যায় তার চারপাশে যারা বসা, তারা তার বন্ধু বান্ধবও না, কাজিনও না। ববং শিক্ষক। সে ‘ইয়াহু’ বলে গলার রগ ছিঁড়ে ফেলার মত জোরে একটা চিৎকার করে ওঠে। স্যাররা কেউ কিছু বলেন না। তারা হাসছেন। জীবনে এমন আনন্দের মুহূর্ত কয়বারই বা আসে। আজ যখন এসেছে, ছেলেটা একটু আনন্দ করুক না। এদিকে চিৎকার করে ওঠার পরপরই হুঁশ হয় জনির। সে লজ্জায় ‘সরি’ ‘সরি’ বলতে থাকে। হেডস্যার বলেন-কিসের সরি। আজকে কোন সরি টরি হবে না। আজকে তোমার আনন্দেন দিন। যাও, গিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ করো। চাইলে বাড়িও চলে যেতে পারো। জনি দৌড়ে অফিস থেকে বের হয়ে যায়। আনন্দের চোটে স্যারকে ধন্যবাদ জানাতেও ভুলে গেছে সে।
জনি পেপারটা এনে জিতুর হাতে দেয়। জিতুর চারপাশে তখন পনের বিশ জন দাঁড়ানো। জিতু পেপারটা খুলে একবার জনির ছবির দিকে তাকায়, একবার জনির মুখের দিকে তাকায়। একবার জনির ছবির উপর হাত বুলায়, একবার তার পিঠে হাত বুলায়। সে যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বন্ধুটির ছবি পত্রিকায় ছেপেছে। তবে সে বিশ্বাস করার চেষ্টা করছে। জনি বলে-আমি এখানে বেশিক্ষণ থাকতে পারবো না দোস্ত। বাড়ি যেতে হবে। শাহেদ ভাইকে ফোন দিতে হবে। শাহেদ ভাই এতো বড় একটা কাজ করে দিয়েছেন! তার সঙ্গে দেখা করতে পারলে সবচেয়ে ভালো লাগত। কিন্তু এখন তো সেটা সম্ভব না। তাই ফোনেই কথা বলি।
-শাহেদ ভাইকে ফোন দেওয়ার জন্যে বাড়ি যেতে হবে কেন? আয় দোকানে গিয়ে ফোন করে আসি।
-নাম্বার লাগবে না? নাম্বার তো আব্বুর মোবাইলে সেভ করা।
-তাহলে আমরা মিষ্টি খাচ্ছি কখন?
-চাইলে এখনই খেতে পারিস। তবে আমার কাছে কিন্তু বেশি টাকা নেই। তিনশো টাকার মত আছে। যদি এই টাকার মিষ্টিতে তোদের হয়ে যায়, তাহলে চল। আর যদি আরো বেশি টাকার মিষ্টি লাগে, তাহলে আগামীকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
জিতুদের তর সয় না। তারা আজই মিষ্টি খাবে। মিষ্টির দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই দোকানদার পত্রিকা হাতে নিয়ে দোকানের বাইরে চলে আসে। সে জনির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলে-তুমি তো মিয়া একদম ফাটায়া দিলা। জনি দোকানের ভেতর তাকায়-আপনার দোকানের ডিব্বা ডাব্বা, মিষ্টির গামলা সবই তো আস্ত আছে। তাহলে কী ফাটালাম। দোকানদার তার তরমুজের বিচির মত দাঁত বের করে হাসতে হাসতে বলে-তুমি কিন্তু মিয়া বড় দুষ্ট। খালি দুষ্টামি করো। আমি কি ডিব্বা ডাব্বা ফাটানির কথা কইছি? আমি কইছি নাম ফাটানির কথা। এই যে তোমার ছবি পত্রিকায় ছাপা হইল, এতে তোমার নাম ফাটল না? তুমি বিখ্যাত হইয়া গেলা না?
-ও, তাই নাকি? আমি বিখ্যাত হয়ে গেছি?
-অবশ্যই তুমি বিখ্যাত হইয়া গেছো। আর বিখ্যাত হইছো বইলাই আমি তোমার লগে একটু কোলাকুলি করতে চাই।
-ঠিক আছে, আসেন কোলাকুলি করি।
-আমারে একটু সময় দিতে হইবো যে?
-কেন?
-কারণ আছে।
দোকানদার দোকানে ঢুকে তার কর্মচারীকে কী যেন বলে। কর্মচারী দোকান থেকে বের হয়ে যায়। হয়তো কোন কাজে তাকে কোথাও পাঠানো হয়েছে। একটু পরেই কর্মচারী ফিরে আসে। তার মাথায় একটা টুল। টুলটা সাধারণ কোনো টুলের মত না। সাধারণ টুলের উচ্চতা যদি হয় দেড় হাত, এই টুলটার উচ্চতা কমপক্ষে আড়াই হাত। দোকানদার কর্মচারির কাছ থেকে টুলটা নিয়ে জনির সামনে রাখে। তারপর টুলটার উপর দাঁড়িয়ে জনিকে বলে-এইবার আসো, কোলাকুলিটা কইরা ফেলি। জনি এগিয়ে আসে এবং দোকানদারের সঙ্গে কোলাকুলি করে।
কোলাকুলি শেষে দোকানদার জিজ্ঞেস করে তারা কেন এসেছে। রবিন বলে-মিষ্টির দোকানে কেউ কি কেরোসিন তেল কিনতে আসে? দোকানদার সুপারিতে কটকট করে কামড় দিতে দিতে বলে-সবাই মিষ্টি খাও, ঠিক আছে। তবে জনিরে কিন্তু মিষ্টি দিতে পারমু না। জনির জন্য যেই সাইজের মিষ্টি দরকার, সেই সাইজের মিষ্টি নাই। আজকা রাইতে বানামু, কাইল আইসা খাইয়া যাইও। জনি অবাক হয়-আমার আবার কেমন সাইজের মিষ্টি দরকার? দোকানদার বলে-তোমার মুখ কত্ত উপরে! ছোট মিষ্টি মুখে দিলে মিষ্টিটা পেটে আইসা পৌঁছাইতে পৌঁছাইতেই তো গইলা যাইবো। তাই তোমার লাইগা বড় সাইজের মিষ্টি দরকার। শক্ত মিষ্টি দরকার। যাতে মুখ থেকে পেটে পৌঁছাইতে দেরি হইলেও পুরাপুরি না গলে। বুঝছ?
।। দশ।।
শাহেদ ভাইকে ফোন করে জনি। প্রথমে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানায়। তারপরই প্রকাশ করতে থাকে অভিমান-আপনি বলেছিলেন নিউজটা ছাপা হওয়ার আগেরদিন আমাকে ফোন করে জানাবেন। জানালেন না কেন? স্যাররা না জানালে তো আমি জানতেই পারতাম না। শাহেদ ভাই হাসেন-গতকাল একবার ভেবেছিলাম তোমাকে ফোন করবো। কিন্তু পরে ভাবলাম ফোন করে আগে থেকে জানিয়ে দিলে সারপ্রাইজটা থাকবে না। তোমাকে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্যেই জানাইনি। আর স্যাররা তোমাকে না জানালে তুমি জানতে পারতে না, এটা ঠিক না। কেউ না কেউ জানাত। একটা জাতীয় দৈনিক লক্ষ লক্ষ মানুষ পড়ে। তোমার পরিচিতদের মধ্যে কারো না কারো চোখে নিউজটা পড়তই।
-যদি বাইচান্স না পড়ত?
-আরে, পড়তই। না পড়লে আমি জানাতাম। আমি বিকেল পর্যন্ত অপেক্ষা করতাম। এরমধ্যে তুমি ফোন না করলে ধরে নিতাম তুমি পেপারটা পাওনি। আমি ফোন করতাম।
-আপনি আমাদের বাসায় কবে আসবেন? আব্বু আপনাকে খুব দেখতে চেয়েছে।
-আসবো আসবো। একদিন হুট করে চলে আসবো। আগে থেকে জানিয়ে আসলে তো সারপ্রাইজ থাকলো না। জনি, আমার জরুরী একটা কল এসেছে। তোমার সাথে একটু পরে কথা বলি?
জনি লাইন কেটে দেয়। এসময় বাইরে মানুষের আনাগোনা শোনা যায়। জনি জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখে দুই তিনটা ছেলে দাঁড়ানো। ছেলেগুলো এই এলাকারই। জনির সমবয়সী। তাদের সঙ্গে জনির প্রায়ই দেখা হয়, কিন্তু কথা হয় না। এছাড়া ছেলেগুলোকে তার কাছে ততটা সুবিধারও মনে হয় না। জনি বাইরে বের হয়। জিজ্ঞেস করে কার কাছে এসেছে। তারা জানায় জনির কাছেই এসেছে। জরুরী কী আলাপ নাকি আছে। জনি সবাইকে বারান্দায় বসায়। জানতে চায় কী আলাপ। ছেলেগুলোর মধ্যে একটা ছেলে বেশ কালো। আফ্রিকার মানুষদের মত। তবে চেহারায় ভদ্রতার ছিটেফোঁটাও নেই। কেমন যেন বজ্জাত বজ্জাত ভাব।
-আমরা তোমার কাছে একটা প্রস্তাব নিয়ে এসেছি। কালো ছেলেটা বলে।
-কী প্রস্তাব?
-তুমি যদি আমাদের প্রস্তাবে রাজি হও, তাহলে তোমাকে খুব ভালো একটা পুরষ্কার দেবো। পুরষ্কারটা কতটা ভালো…
-পুরষ্কারের কথা পরে হবে। আগে শুনি প্রস্তাবটা কী।
-বলবো। আসলে তোমার কথা আমাদের মাথায় আসত না। আজ পত্রিকায় তোমাকে নিয়ে রিপোর্ট ছাপার পরই তোমার কথাটা মাথায় আসল আরকি। রিপোর্টটা কিন্তু ভালো হয়েছে। ছবিতে তোমাকে খুবই সুন্দর লাগছিল। আমরা খুব মন দিয়ে পড়েছি রিপোর্টটা। আমি তো পরপর তিনবার পড়ে ফেলেছি।
-ধন্যবাদ। এখন প্রস্তাবটা শুনি।
-আমাদের একটা কাজ করে দিতে হবে।
-আমি তোমাদের কাজ করে দেবো? কী কাজ? আমি তো তেমন কোন কাজ পারি না।
-তেমন কোন কাজ না পারলেও এই কাজটা অবশ্যই তুমি পারবে। এটা তোমারই কাজ। আমরা কেউ পারবো না। যদি পারতাম তাহলে কি তোমার কাছে আসতাম? তোমাকে পুরস্কার দিতে চাইতাম? এবার বলি কাজটা কী। আমাদের পাড়ায় খুব কৃপণ একজন মানুষ আছে। তার ফলের বাগান ফলে ভরা। কিন্তু কাউকে দেয় না। গতকাল তার আমের বাগান থেকে আমি একটা ফল পেড়েছিলাম, আমাকে খুবই গালাগালি করেছে। তাই আমি তার উপর প্রতিশোধ নিতে চাই।
-কী রকম প্রতিশোধ?
-তার আমের বাগান খালি করে ফেলতে চাই। আর কাজটা আমরা করতে চাই রাতেরবেলা।
-আমাকে আম পেড়ে দিতে হবে, এই তো?
-আরে না, তোমাকে আম পেড়ে দিতে হবে না। আম আমরাই পাড়বো। শোনো, এই কিপ্টে লোকটা সারারাত বাগান পাহারা দেয়। বাদুড়কেও একটা আম খেতে দেয় না। চোর ডাকাত কোনকিছুকেই সে ভয় পায় না। বাগানের আশপাশে কোনোকিছু নড়াচড়া করলেই সে লাঠি নিয়ে তেড়ে যায়। তবে সে একটা জিনিসকে ভয় পায়। আমরা এই সুযোগটা কাজে লাগাতে চাই।
-জিনিসটা কী?
-ভূত।
-ভূত!
-হ্যাঁ, ভূত। লোকটা ভূতকে ভয় পায় বলেই আমরা তোমার কাছে এসেছি। তোমার যা হাইট, তাতে তুমি যদি সাদা একটা কাপড় পরে রাতে তার সামনে গিয়ে দাঁড়াও, সে হয় দৌড়ে পালাবে, নয়তো পড়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলবো। আমরা যত খুশি আম পাড়বো। বিক্রি করবো। খাবো। তোমাকেও খেতে দেবো। এছাড়া পুরষ্কার তো পাবেই।
ছেলেটার প্রস্তাব হজম করতে একটু সময় নেয় জনি। তারপর বলে-আমি লম্বা বলে তোমরা আমাকে ভূত সাজাতে চাইছো, তাই না? ছেলেটা হাসিমুখে বলল-জ্বি জ্বি। জনি কথা চালিয়ে যায়-আমি না হয় ভূত সাজলাম। কিন্তু তোমরা নিশ্চয়ই জানো ভূতেরা ঘাড় মটকায়। জানো না? সবাই সমস্বরে বলল-জানি। যেহেতু জানো, সেহেতু এখানে তোমাদের আর দেরি করা উচিত হবে না। যদি আস্ত ঘাড় নিয়ে বাড়ি ফিরতে চাও, তাহলে পালাও। কালো ছেলেটা চেহারা বিচ্ছিরি করে বলল-মানে কী? মানে কী বুঝতে পারছো না? আমি এখন তোমাদের ঘাড় মটকাবো। এমনভাবে মটকাবো যে, মুখ চোখ নাক চলে যাবে পেছন দিকে। আর পেছনের দিকটা চলে আসবে সামনে।
ছেলেগুলো বসা থেকে দাঁড়িয়ে গেল। কালো ছেলেটার চেহারায় হিং¯্রতা ভর করল। সে বারান্দা থেকে নামতে নামতে বলল-এই অপমানের প্রতিশোধ আমরা নেবো। জনি বিদ্রƒপের হাসি হাসল-আরে যা যা। প্রতিশোধ যখন নিবি তখন বলিস। আগে থেকে গলাবাজি করে লাভ নেই। তবে আরেকদিন যদি এই টাইপের প্রস্তাব নিয়ে আসিস, তাহলে তোদের ঘাড় আমি শিওর মটকাবো। দুদিন পরের ঘটনা। জনি বিকেলে ঘুরতে বেরিয়েছে। ঘুরতে ঘুরতে বাড়ি থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে চলে গেল। তখন সন্ধ্যা হতে আর বেশি সময় বাকি নেই। বিশ মিনিটের মধ্যেই হয়তো মাগরিবের আযান পড়বে। রাস্তায় কালো ছেলেটার সাথে দেখা। জনির ভেতরে একটা মোচড় মারল। ছেলেটা যদি এখন তার উপর প্রতিশোধ নেয়? তাকে এখন কে বাঁচাবে?
ছেলেটা জনির দিকে একবার তাকায়। তারপর পাশ কাটিয়ে চলে যায়। জনি ধরে নেয় বিপদ কেটে গেছে। কিন্তু বিপদ আসলে কাটে না। ছেলেটা একা জনির সঙ্গে মারামারি করে পারবে না, তাই অন্যদের আনতে গিয়েছিল। একটু পরেই ছয় সাতজনকে নিয়ে এসে জনির পথ রোধ করে। জনি মেইনরোড থেকে নেমে চিকন একটা পথ ধরে দৌড়াতে থাকে। ছেলেগুলোও তার পিছু নেয়। জনি যদি ঠিকমত দৌড়াতে পারত, তাহলে ছেলেগুলো থেকে সে পঞ্চাশ হাত এগিয়ে থাকতে পারত। কারণ ওদের পায়ে ˜িগুণ তিনগুণ লম্বা তার পা। কিন্তু সে ঠিকমত দৌড়াতে পারছে না গাছের জন্যে। এই চিকন পথের দুইপাশে অসংখ্য গাছ। আর গাছগুলোর ডাল ছড়িয়ে আছে পথের উপর। জনির মাথা সেইসব ডালে বাড়ি লাগছে। তাই সে নুয়ে নুয়ে দৌড়াচ্ছে। আর এভাবে দৌড়াচ্ছে বলেই দৌড়ে তত গতি নেই।
দৌড়াতে দৌড়াতে জনি যে এলাকায় চলে এসেছে, এদিকে সে আগে কখনোই আসেনি। তাই এই এলাকার কোথায় কী আছে, তার জানা নেই। হঠাৎ জনির সামনে পড়ে একটা খাল। খালের পানিতে তীব্র স্রােত। পড়লে খড়কুটোর মত ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। জনি বুঝে ফেলে, ছেলেগুলো জেনেশুনেই তাকে দৌড়াতে দৌড়াতে এদিকে নিয়ে এসেছে। খালপাড় এসে যখন সে আর সামনে যেতে পারবে না, তখন সবাই মিলে পেটাবে। পিটিয়ে হাত পা ভেঙে খালের পানিতে ফেলেও দিতে পারে। জনি খালের পাড়ে দাঁড়িয়ে গেলে ছেলেগুলো হাসতে হাসতে তার দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। জনি শেষবারের মত খালের প্রস্থটা দেখে নেয়। তারপর তার বাঁশের মত লম্বা লম্বা পা দিয়ে একটা লাফ মারে। একলাফে পাড় হয়ে যায় খাল। কালো ছেলেটাসহ আরো দুজন তার দেখাদেখি লাফ মারতে গিয়ে পড়ে যায় খালের মাঝখানে।
।। এগার।।
পরদিন ক্লাসে গিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেয় জনি। জিতু তো তার দিক থেকে চোখ ফেরাতেই পারে না। মার্বেলের মত গোল গোল চোখে তাকিয়ে থাকে তো থাকেই। জনি জানে কেন জিতু এভাবে তাকিয়ে আছে। তবু জিজ্ঞেস করে-কীরে, কী দেখছিস? জিতু বলে-আমি তোর সাহস দেখে অবাক হয়ে যাচ্ছি। আমরা এতো বছর ধরে এই স্কুলে পড়েও যে কাজটা করতে পারেনি, তুই নতুন এসেই সেটা করে ফেললি? তবে বেশি সাহস কিন্তু ভালো না। এখনও তো স্যাররা তোকে দেখেনি। দেখলে অবস্থা খারাপ করে দেবে। এখনও সময় আছে, চিন্তা করে দেখ কী করবি। স্যাররা দেখলে তোকে ঝাড়বেই। ক্লাস থেকেও বের করে দিতে পারে।
-এক গাদা কথা বলে ফেললি। অথচ কী হয়েছে সেটাই বুঝতে পারলাম না।
-তুই এটা কী পরে এসেছিস?
-কী আবার? প্যান্ট।
-এটা প্যান্ট?
-প্যান্ট না তো কী? লুঙ্গি?
-বুঝলাম প্যান্ট। কিন্তু ফুলপ্যান্ট তো না। হাফপ্যান্ট। বড়জোর থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট। এই স্কুলের কাউকে কোনদিন থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট পরে ক্লাসে আসতে দেখেছিস? হেডস্যার বহুবছর আগেই নিয়ম করে দিয়েছেন একমাত্র শার্ট প্যান্ট ছাড়া আর কোন পোশাক পরে স্কুলে আসা যাবে না।
-কিন্তু কারো যদি প্যান্ট না থাকে, তাহলে সে কী করবে? স্কুলে আসবে না?
-প্যান্ট না থাকে মানে? তুই কি বলতে চাচ্ছিস তোর প্যান্ট নেই?
-শুধু বলতে চাচ্ছি না, ডাইরেক্ট বলেই ফেলছি আমার প্যান্ট নেই। থাকলেও স্কুলে পরে আসার মত নেই। দুইটা প্যান্ট ময়লা হয়ে আছে। এতো ময়লা প্যান্ট পরে স্কুলে আসলে তোরা আমাকে তোদের পাশে বসতে দিতি না। আরেকটা প্যান্টের কোমর বেশ টাইট হয়। আরেকটা প্যান্টের…
-থাম। ঐসব প্যান্টের কথা বাদ দে। গতকাল যে প্যান্টটা পরে এসেছিলি, সেটা পরে আসলেই তো পারতি।
-এই প্যান্টটা এখন দর্জির দোকানে আছে। মেরামত করতে দিয়েছি।
-কেন, কী হয়েছে?
জনি এবার গতকালের তাড়া খাওয়ার ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলে-যখন আমি খালটা পাড় হওয়ার জন্যে লাফ দিলাম, শুনলাম ফড়াৎ করে একটা আওয়াজ হলো। কিসের আওয়াজ, কেন হলো আওয়াজটা-এইসব নিয়ে ভাবার টাইম তখন ছিল না। কিছুদূর এসে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে হাঁপাচ্ছিলাম। তখন ছোট ছোট তিনটা ছেলে আমার দিকে তাকিয়ে মিটমিট করে হাসছিল। আমি বুছতে পারছিলাম না কেন হাসছে। জিজ্ঞেস করলাম কী হয়েছে। তারা আঙুল দিয়ে আমার প্যান্ট দেখাল। দেখি প্যান্টের সেলাই ফেটে গেছে। তার মানে ফড়াৎ করে যে আওয়াজটা হয়েছিল, সেটা প্যান্ট ফাটার আওয়াজই ছিল। আমার তো তখন লজ্জায় মরে যাওয়ার দশা।
জনির লজ্জায় মরে যাওয়ার দশা হলেও জিতুর মরে যাওয়ার দশা হয় হাসতে হাসতে। প্যান্ট ফাটার দৃশ্যটা যে যতই কল্পনা করে, ততই তার হাসির গতি বাড়তে থাকে। অবশেষে অনেক ধমকিয়ে ধামকিয়ে তার হাসি থামায় জনি। বলে-সবগুলো প্যান্ট অকেজো হয়ে যাওয়ায় আমি কোন প্যান্টই পাচ্ছিলাম না পরে আসার জন্যে। হঠাৎ আলনার কাপড় সরাতে গিয়ে দেখি ভাইয়ার একটা পুরনো প্যান্ট। প্যান্টটা ভাইয়ার একটু লম্বা হয়। তাই ভাইয়া এটা পরে না। আমি পরে ফেললাম। কিন্তু পরার পর দেখি প্যান্টটা আর ফুলপ্যান্ট নেই। হয়ে গেছে থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট। জিতু উচ্চস্বরে হাসতে হাসতে বলে-লম্বার জন্যে যে প্যান্ট বড় ভাই পরতে পারে না, ছোট ভাইয়ের সেই প্যান্ট লম্বা তো হয়ই না, হয়ে যায় থ্রি কোয়ার্টার। কেউ আমাকে ধর। একটু শান্তিমত হাসি।
জিতুর আর শান্তিমত হাসা হয় না। ক্লাসের ঘণ্টা পড়ে গেছে। জনি ক্লাসে ঢুকে এমন একটা জায়গায় বসে, যেখানে স্যার যাবেন দূরের কথা, স্যারের চোখও যাবে না। স্যারের চোখের আড়ালে থাকাটা আজ তার জন্যে জরুরী। কারণ স্যারের হাতে ধরা পড়লে প্যান্ট ফাটার ঘটনাটা পূনঃপ্রচার করতে হবে। তখন তো শুধু জিতু হেসেছে, এখন হাসবে পুরো ক্লাস। তাকে আজীবনের জন্যে জোকার হয়ে যেতে হবে। স্যার রোল কল করে সবার দিকে এক ঝলক তাকালেন। জনি স্বাভাবিক থাকল। তাই স্যারের চোখ তার উপর আটকালো না। সে মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে গেল পার পেয়ে গেছে। আর এই স্যারের হাতে ধরা না খেলে অন্যান্য স্যারের হাতে ধরা খাওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই কম। কারণ প্রথম ক্লাসটা যিনি নেন, তিনিই বেশি খেয়াল করেন কে কী পরে এলো।
কথায় বলে-যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই রাত হয়। স্যার প্রথমে সামনের বেঞ্চের একজনকে পড়া জিজ্ঞেস করলেন। তারপর তৃতীয় বেঞ্চের একজনকে। এরপর কী মনে করে যেন চলে গেলেন জনির কাছে। জনি দু চারটা বাক্য ঠিকঠাকই বলল। তারপরই বাধিয়ে বসল গন্ডগোল। স্যার রেগে গেলেন-এই সামান্য পড়াটাও শিখে আসতে পারো না? দাঁড়াও, বেঞ্চের উপর দাঁড়াও। জনি কাঁচুমাচু করতে লাগল। এখন বেঞ্চের উপর দাঁড়ালে স্যার পড়ার কথা ভুলে গিয়ে শুধু তার প্যান্ট নিয়েই কথা বলবেন। তার মুখ থেকে আসল ঘটনা বের না করে ক্ষান্ত হবেন না। তারপর কতক্ষণ ধরে যে হাসাহাসি চলবে! হয়তো অন্যান্য ক্লাসের ছাত্ররাও এসে যোগ দেবে হাসিতে।
স্যারের আদেশ মানা হচ্ছে না দেখে স্যার গর্জন করে উঠলেন-এই বেয়াদব ছেলে, তোমাকে আমি বেঞ্চের উপর দাঁড়াতে বললাম না? এবার জনি ভয় পেয়ে এক লাফে উঠে গেল বেঞ্চে। কিন্তু সোজা হয়ে দাঁড়াতে গিয়েই ঘটিয়ে বসল অঘটন। এমনিতেই এই রুমের পাটাতনটা একটু নড়বড়ে ছিল। অনেক দিনের পুরনো হলে যায় হয়। জনির মাথার গুতো লেগে আস্ত পাটাতনটা খসে পড়ল ছাত্র ছাত্রীদের মাথায়। বাদ গেল না স্যারের মাথাও। ক্লাসজুড়ে লেগে হাঙ্গামা। এই হাঙ্গামা ছড়িয়ে পড়ল পুরো স্কুলে। হেডস্যার এসে খোঁজ নিলেন কেউ বড় কোন আঘাত পেয়েছে কিনা। না, কেউই তেমন কোন আঘাত পায়নি। কারো কারো শরীরের চামড়া একটু ছিলে গেছে।
স্যাররা চলে যাওয়ার পর শুরু হয় ঝড়ো হাসি। রবিন একটা কথা তিনবার বলতে চেয়েও বলতে পারছে না। হাসির জন্যে কথা আটকে যাচ্ছে। চতুর্থবারের মাথায় সে বলতে পারে-আজতো শুধু আমাদের উপর পাটাতন ভেঙে পড়েছে। তুই যদি আরেকটু লম্বা হতো, তাহলে আমাদের উপর আকাশ ভেঙে পড়ত। কারণ তখন তোর মাথা গিয়ে আকাশে গুঁতো খেত। হা হা হা। জিতু বলে-যত দিন যাচ্ছে ততই একটা কবিতা আমার খুব প্রিয় হয়ে যাচ্ছে। কোন কবিতাটা জানিস? ঐযে ঐ কবিতাটা-‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে, কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে।’ কবিতাটা আমার প্রিয় হওয়ার কারণ হচ্ছে, কবিতাটা পড়লেই জনির কথা মনে পড়ে। অবশ্য এরজন্যে কবিতার একটা ওয়ার্ড চেঞ্জ করে নিতে হয়।
-কোনটা?
-‘কাজে’ ওয়ার্ডটা। চেঞ্জ করে নিলে কবিতাটা হয়-‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে, কথায় না বড় হয়ে সাইজে বড় হবে।’ হা হা হা।
জনি এখন জিতুর কথার দাঁতভাঙা জবাব দিতে পারত। কিন্তু সে অস্বস্তিতে আছে বলে কাউকে কিছু বলতে চাচ্ছে না। জনি অস্বস্তিতে আছে তার মাথা নিয়ে। পাটাতনে বাড়ি লেগে মাথায় হালকা ব্যথা পেয়েছে। তবে অস্বস্তি এই ব্যথার জন্যে না। তার অস্বস্তির কারণ-মাথায় কী যেন হাঁটছে। এমনভাবে হাঁটছে, মনে হচ্ছে উকুন। কিন্তু তার চুলে তো উকুন নেই! নিয়মিত উকুননাশক শ্যাম্পু দিয়ে সে মাথা ধোয়। তাহলে কী হতে পারে? জনি জিতুদের কাছ থেকে একটু দূরে গিয়ে মাথা ঝাড়া দেয়। আর অমনি চুলের ভেতর থেকে চার পাঁচটা উইপোকা খসে পড়ে মাটিতে। পাটাতনে উইপোকা ছিল কে জানত! জনি উইপোকাগুলো লুকানোর চেষ্টা করেও পারে না। জিতুরা ঠিকই দেখে ফেলে।
।। বারো।।
পরদিন কাপড় দিয়ে মাথা প্যাঁচিয়ে ক্লাসে আসে জনি। জিতু এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করে-মাথায় নিশ্চয়ই বরফ দিয়েছিস? মাথা বেশি ব্যথা করছে নাকি? জনি হাতের আঙুলের পেট দিয়ে মাথার কাপড়ে চাপ দিতে দিতে বলে-মাথা ব্যথাও করছে না, বরফও দেইনি। কাপড় প্যাচিয়েছি অন্য কারণে। কারণটা এখন বলা যাবে না। স্কুল ছুটি হোক, তখন শুনিস। স্কুল ছুটি হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করার ধৈর্য নেই দুষ্টু জিতুর। সে এখনই মাথার কাপড়টা সরাতে চায়। কিন্তু চাইলেই তো শুধু হবে না। জনির মাথা তো নাগাল পেতে হবে। কীভাবে তার মাথাটা নিচু করা যায়, সে ভাবতে থাকে। ভাবতে ভাবতে যুৎসই একটা বুদ্ধি পেয়ে যায়।
জিতু নিজের কলমটা জনির সামনে ফেলে দেয়। জনি অন্যদিকে তাকিয়ে কথা বলার কারণে কলমটা দেখতে পায় না। জিতু এবার জনির কাছ থেকে একটু দূরে সরে গিয়ে বলে-জনি, তোর পায়ের কাছে এটা কী দেখা যাচ্ছে? কলম নাকি? জনি নিচের দিকে তাকিয়ে বলে-হ্যাঁ, কলমই তো। কার কলম এটা? আর একটু হলেই তো পাড়া মারতাম। জনি এবার কলমটা তোলার জন্যে নিচু হয়। জিতু দ্রুত তার কাছে এসে টান দিয়ে মাথার কাপড়টা নিয়ে নেয়। সবাই দেখতে পায় জনির মাথায় কোন চুল নেই। কামিয়ে ফেলেছে। জিতু অবাক হয়ে জানতে চায়-কীরে, এটা কী করেছিস? রবিন বলে-তোর মাথায় ঠাটা পড়েছিল নাকি? ঠাটা বুঝিস? বজ্রপাত।
-কামিয়ে ফেলেছি।
-কামিয়ে ফেলেছিস, তাতো দেখতেই পাচ্ছি। কিন্তু কামালি কেন? তোর মত দামড়া ছেলে মাথা টাক করে?
-চুলের ভেতর অনেকগুলো উইপোকা ঢুকে গিয়েছিল। একটা ফেললে আরেকটা বের হয়, আরেকটা ফেললে আরেকটা বের হয়। সবাই বলল পরবর্তীতে নাকি সমস্যা হতে পারে। তাই মাথা সাফ করে ফেললাম।
-খুব ভালো করেছিস। তবে এখন থেকে আসগর মিয়ার দোকানে গেলে একটু সাবধানে যাস।
-কেন?
-আসগর মিয়ার দোকানের কাছেই একটা বেলগাছ আছে, নিশ্চয়ই দেখেছিস?
-তো?
-যেহেতু বেলগাছ আছে, তাই সাবধান থাকতেই হবে। জানিস না, ন্যাড়াদের বেলতলায় যাওয়া মানা?
জনি কিছু বলে না। তার মনটা ভালো নেই। স্কুলে আসার সময় একটা খারাপ খবর শুনে এসেছে। খবরটা শোনার পর থেকেই তার অস্থির লাগছে। মনে হচ্ছে খুব বড় কোন অপরাধ করে ফেলেছে। জনি যখন দেবদারু গাছটার নিচে আসে, তখন সেই কালো ছেলেটার এক বন্ধুর সাথে দেখা হয়ে যায়। ঐদিন সেও জনিকে দৌড়িয়েছিল। জনি তাকে দেখেই হাঁটার গতি বাড়িয়ে দেয়। ছেলেটা তাকে ডাক দেয়। তার গলার স্বর শুনেই জনির ভয় কেটে যেতে থাকে। খুব মোলায়েম স্বর। বন্ধুসুলভ। এই স্বরে কেউ কাউকে ডাকার পর সে আর তাকে মারতে পারে না, গালাগালি করতে পারে না। এই স্বরে কেবল এক বন্ধুই আরেক বন্ধুকে ডেকে থাকে।
জনি দাঁড়ায়। ছেলেটা তার কাছে যায়। গিয়ে বিনীতভাবে বলে-তুমি সেলিমকে ক্ষমা করে দিও ভাই। তুমি ক্ষমা না করলে হয়তো সে কোনদিনই সুস্থ হবে না। জনি জিজ্ঞেস করে-সেলিম কে? ছেলেটা বলে-আমার বন্ধু। তুমি তাকে চেনো। তোমাদের বাড়িতে গিয়েছিল। আবার সেদিন তোমাকে দৌড়িয়েছিল। কালো করে। কী হয়েছে ওর? তোমার দেখাদেখি খাল পাড় হওয়ার জন্যে লাফ দিতে গিয়ে খালে পড়ে গিয়েছিল। তখন চোখা একটা বাঁশের কঞ্চি তার পায়ে ঢুকে যায়। ডাক্তার বলেছে কঞ্চিটা তার পা থেকে বের করতে বড় একটা অপারেশন করতে হবে। আর এই অপারেশনের জন্যে পাঁচ লাখ টাকা তো লাগবেই। এতো টাকা যোগাড় করার মত সামর্থ সেলিমের বাবার নেই। অপারেশন করতে না পারলে হয়তো পঁচন ধরবে। শেষে পাটা কেটেও ফেলে দিতে হতে পারে।
এই কদিনে বিছানার সাথে মিশে গেছে সেলিম। সারাদিন শুয়ে থাকে। ঘুমুতে পারলে হয়তো একটু ভালো লাগত। কিন্তু ঘুমও আসে না। সারাদিন দুরন্তপনা করে বেড়ানো সেলিমের কাছে হাসপাতালের বেডটাকে হাজতের চেয়েও কষ্টের জায়গা বলে মনে হয়। পায়ের জখমটা এতো মারাত্মক না হলে সে কবে এখান থেকে পালিয়ে যেত! দশটা ডাক্তার পিছু পিছু দৌড়িয়েও তাকে ধরতে পারত না। হাসপাতালের জানালা দিয়ে একটা খেলার মাঠ দেখা যায়। বিকেল হলেই কিছু ছেলে এখানে খেলতে আসে। সেলিম তাদের খেলা দেখে আর ভাবে সে হয়তো আর কোনদিন খেলতে পারবে না। হয়তো হাঁটতেও পারবে না আগের মত। হাঁটতে হবে ক্রাচে ভর করে, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। সেলিমের চোখের পানিতে বালিশ ভিজে যায়।
-সেলিম ঘুমিয়েছো?
চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকা সেলিমকে জিজ্ঞেস করে কেউ। সেলিম চোখ খোলে। দেখে জনি দাঁড়িয়ে আছে। সেলিম চোখ রগড়ায়। কাকে দেখছে সে? জনিই তো? সেলিম দৃষ্টিহীনদের মত জিজ্ঞেস করে-কে? উত্তর আসে-আমি জনি। তুমি এখন কেমন আছো সেলিম? সেলিম কোন কথা না বলে দু হাত বাড়িয়ে দেয়। জনি তার কাছে এলে সে তাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে-আমার সব শেষ হয়ে গেছে জনি, আমার সব শেষ হয়ে গেছে। তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিও। আমি তোমার উপর অনেক অন্যায় করে ফেলেছি। জনি সেলিমের কান্না থামিয়ে তার চোখ মুছে দিতে দিতে বলে-তোমার কিচ্ছু হবে না। কিচ্ছু হবে না তোমার।
-আমাকে মিথ্যে সান্ত¦না দিচ্ছ জনি?
-মিথ্যে সান্ত¦না সেলিম। দেখো, ইনশাআল্লাহ তোমার কিছুই হবে না। আমরা থাকতে তোমার এতো বড় ক্ষতি হয়ে যাবে, এটা হয় নাকি! তুমি নিশ্চিন্ত মনে আল্লাহকে ডাকো। দেখবে সময়মত তোমার অপারেশনের সব ব্যবস্থা হয়ে গেছে।
পরদিন স্কুলে গিয়ে সেলিমের ঘটনাটা জিতুকে বলে জনি। জিতু বলে-সেলিমের এই অবস্থার জন্যে তুই দায়ী, এমনটা মনে করা কিন্তু বোকামি। এটা একটা অ্যাক্সিডেন্ট। এছাড়া তুই তো আর তাকে ধাক্কা দিয়ে খালে ফেলে দিসনি। সেদিন সে যদি খালে না পড়ত আর তোকে যদি ধরতে পারত, তাহলে তোর কী অবস্থা হতো, ভাব। এতোকিছুর পরও তুই তাকে দেখতে গেছিস, তাকে ক্ষমা করে দিয়েছিস, এটা তোর উদারতা। এখানেই বিষয়টা শেষ হওয়া উচিত। কিন্তু তুই তাকে বলে এসেছিস সময়মত নাকি তার অপারেশনের ব্যবস্থা হয়ে যাবে। এখন তো সে নতুন করে আশাবাদী হবে। তুই কীভাবে তার আশা পূরণ করবি? খামোখা কেন তাকে কথা দিতে গেলি?
-আমরা কি তার জন্যে কিছু করতে পারি না?
-কী করবো? কী করার আছে আমাদের?
-আমরা যদি তার অপারেশনের কথা বলে স্কুলের সবার কাছ থেকে টাকা ওঠাই?
-এটা সম্ভব না দুই কারণে। প্রথম কারণ-সেলিম এই স্কুলের ছাত্র না। এই স্কুলের ছাত্র হলে সবাই যেভাবে হাত খুলে দান করত, সেলিমের জন্যে সেভাবে করবে না। আর হাত খুলে দান না করলে বেশি টাকা উঠবে না। সারা স্কুল থেকে যদি মাত্র বিশ পঞ্চাশ হাজার টাকা ওঠে, তাহলে তা দিয়ে তো আর অপারেশন হবে না। ওষুধপত্র কিনতেই এই সামান্য টাকা চলে যাবে। দ্বিতীয় কারণ-এলাকায় সেলিমের ইমেজ ভালো না। সবাই তাকে বখাটে হিসেবে জানে। তার চিকিৎসার জন্যে কেউ দান করতে চাইবে না। তার জন্যে টাকা ওঠাতে গেলে তোর ইমেজও খারাপ হয়ে যেতে পারে। সবাই ভাবতে পারে তুইও সেলিমের মতই বখাটে। এই জন্যেই তার প্রতি তোর এতো দরদ।
জিতুর কথায় হতাশ হয় জনি। তবে হাত পা গুটিয়ে বসে থাকার সিদ্ধান্ত সে নিতে পারে না। কীভাবে নেবে? তার ভরসা পেয়ে সেলিমের মুখে হাসি ফুটেছে। এই হাসি সে ফুরিয়ে যেতে দেবে? কক্ষনো না। সেলিমের অপারেশনের টাকা সে যোগাড় করবেই।পরদিন সময়মতই স্কুলে আসে জনি। তার হাতে ব্যান্ডেজ, পায়ে ব্যান্ডেজ, মাথায় ব্যান্ডেজ। তাকে দেখে হাসি চেপে রাখতে পারে না জিতুরা। রবিন বলে-কনসার্টে শোয়ার কিছুক্ষণ পরেই তুই ঘুমিয়ে পড়েছিলি শুনেছি। কিন্তু শুয়ে স্বপ্ন দেখেছিলি কিনা, তা কিন্তু শুনিনি। এখন যদি একটু বলিস আরকি। জনি বেঞ্চে বসতে বসতে বলে-আমি স্বপ্নবাজ মানুষ। স্বপ্ন তো অবশ্যই দেখেছিলাম। দেখি আমি একটা নদীরপাড়ে শুয়ে আছি। শুয়ে শুয়ে নদীর কলকল শব্দ শুনছি। পাখির গান শুনছি। রাখালের বাঁশির সুর শুনছি। নদীরপাড়ে কয়েকটা তালগাছ। সবগুলো গাছেই পাকা পাকা তাল। আমি তালগুলো দেখছি। হঠাৎ ধুপধাপ করে আমার উপর তাল পড়তে লাগল। তাকিয়ে দেখি তাল তো না, মানুষের পা পড়ছে আমার উপর।
হাসতে হাসতে পুরো ক্লাসরুম মাথায় তুলে ফেলল জিতুরা। স্যার হয়তো আরো কিছুক্ষণ পর ক্লাসে আসতেন। কিন্তু হাসির শব্দ শুনে আগেভাগেই চলে এলেন। তাই জনিকে আর খোঁচানোর সুযোগ পেল না জিতুরা। ক্লাস শেষে স্যার চলে যেতেই আবার তারা তাকে ঘিরে ধরল। এসময় মনির এসে বলল মনসুর স্যার জনিকে ডাকছেন। জনির মুখ ঘোলাটে হয়ে গেল। এখন মনসুর স্যারের কাছে যাওয়া মানেই বিপদে পড়া। ভরা অফিসে দাঁড়িয়ে সব স্যারের সামনে ঘটনার বিশদ বিবরণ দিতে হবে। তাদের বকাবকি সহ্য করতে হবে। জনির যদি পালানোর অভ্যাসটা এখনও থাকতো, তাহলে আজ তার পালানো কেউ ঠেকাতে পারত না। যেহেতু অভ্যাসটা নেই, অতএব সে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে যায় অফিসের দিকে।
অফিসরুমের দরজা পর্যন্ত যাওয়ার আগেই মনসুর স্যারের দেখা পেয়ে যায় জনি। স্যার অফিস থেকে বের হয়ে এদিকটায় আসছিলেন। জনি দারুণ বাঁচা বেঁচে যায়। কারণ তাকে অন্যান্য স্যারদের সামনে পড়তে হচ্ছে না। কিন্তু স্যার যখন মুখ খোলেন, তখন সে বুঝতে পারে আসলে সে বেঁচে যায়নি। বরং স্যার এগিয়ে এসেছেন তাকে অন্যান্য স্যারদের সামনে নিয়ে যাওয়ার জন্যে। মনসুর স্যার জনির গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বলেন-তোমার জন্যে সবাই অপেক্ষা করছে। কেউ কেউ তো ক্লাস বাদ দিয়ে বসে আছে তোমাকে দেখার জন্যে। চলো। স্যার হয়তো সন্দেহ করছেন, যেকোন সময় জনি ঝেড়ে দৌড় দিতে পারে। আর এই জন্যেই তিনি তার গা ঘেষে দাঁড়িয়েছেন। দৌড় দিতে চাইলেই চোর ধরার স্টাইলে ধরে ফেলবেন।
মনসুর স্যার অফিসে ঢোকেন। আর জনি দরজায় দাঁড়িয়ে সবাইকে সালাম দেয়। হেডম্যার সালামের জবাব দিয়ে জনিকে বলেন তার কাছে যাওয়ার জন্যে। জনির হাত পা জমে আসছে। তবু যেতেই হবে। সে গিয়ে হেডস্যারের টেবিলের কোণা বরাবর দাঁড়ায়। হেডস্যার জিজ্ঞেস করলেন-এই ঘটনা ঘটালে কবে? জনি বলল-স্যার, গতকাল। কলেজ মাঠে কনসার্ট দেখতে গিয়ে। হেডস্যার হাসলেন-আরে বোকা, আমি তোমার অ্যাক্সিডেন্টের কথা জিজ্ঞেস করিনি। গতকাল তুমি কী কান্ড ঘটিয়েছো, এটা আমরা সবাই জানি। আমি বলেছি অন্য ঘটনার কথা। তুমি তো চারদিকে হইচই ফেলে দিয়েছো। এখন পর্যন্ত আমার কাছে কয়টা ফোন এসেছে জানো?
-স্যার আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।
-কিছুই বুঝতে পারছো না?
-না স্যার।
-এই নাও, এটা ভালো করে দেখো। দেখো কিছু বুঝতে পারো কিনা।
স্যার জনির হাতে একটা পেপার ধরিয়ে দেন। পেপারে নিজের ছবি দেখে সে ভুলেই যায় এটা অফিসরুম। ভুলেই যায় তার চারপাশে যারা বসা, তারা তার বন্ধু বান্ধবও না, কাজিনও না। ববং শিক্ষক। সে ‘ইয়াহু’ বলে গলার রগ ছিঁড়ে ফেলার মত জোরে একটা চিৎকার করে ওঠে। স্যাররা কেউ কিছু বলেন না। তারা হাসছেন। জীবনে এমন আনন্দের মুহূর্ত কয়বারই বা আসে। আজ যখন এসেছে, ছেলেটা একটু আনন্দ করুক না। এদিকে চিৎকার করে ওঠার পরপরই হুঁশ হয় জনির। সে লজ্জায় ‘সরি’ ‘সরি’ বলতে থাকে। হেডস্যার বলেন-কিসের সরি। আজকে কোন সরি টরি হবে না। আজকে তোমার আনন্দেন দিন। যাও, গিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ করো। চাইলে বাড়িও চলে যেতে পারো। জনি দৌড়ে অফিস থেকে বের হয়ে যায়। আনন্দের চোটে স্যারকে ধন্যবাদ জানাতেও ভুলে গেছে সে।
জনি পেপারটা এনে জিতুর হাতে দেয়। জিতুর চারপাশে তখন পনের বিশ জন দাঁড়ানো। জিতু পেপারটা খুলে একবার জনির ছবির দিকে তাকায়, একবার জনির মুখের দিকে তাকায়। একবার জনির ছবির উপর হাত বুলায়, একবার তার পিঠে হাত বুলায়। সে যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বন্ধুটির ছবি পত্রিকায় ছেপেছে। তবে সে বিশ্বাস করার চেষ্টা করছে। জনি বলে-আমি এখানে বেশিক্ষণ থাকতে পারবো না দোস্ত। বাড়ি যেতে হবে। শাহেদ ভাইকে ফোন দিতে হবে। শাহেদ ভাই এতো বড় একটা কাজ করে দিয়েছেন! তার সঙ্গে দেখা করতে পারলে সবচেয়ে ভালো লাগত। কিন্তু এখন তো সেটা সম্ভব না। তাই ফোনেই কথা বলি।
-শাহেদ ভাইকে ফোন দেওয়ার জন্যে বাড়ি যেতে হবে কেন? আয় দোকানে গিয়ে ফোন করে আসি।
-নাম্বার লাগবে না? নাম্বার তো আব্বুর মোবাইলে সেভ করা।
-তাহলে আমরা মিষ্টি খাচ্ছি কখন?
-চাইলে এখনই খেতে পারিস। তবে আমার কাছে কিন্তু বেশি টাকা নেই। তিনশো টাকার মত আছে। যদি এই টাকার মিষ্টিতে তোদের হয়ে যায়, তাহলে চল। আর যদি আরো বেশি টাকার মিষ্টি লাগে, তাহলে আগামীকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
জিতুদের তর সয় না। তারা আজই মিষ্টি খাবে। মিষ্টির দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই দোকানদার পত্রিকা হাতে নিয়ে দোকানের বাইরে চলে আসে। সে জনির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলে-তুমি তো মিয়া একদম ফাটায়া দিলা। জনি দোকানের ভেতর তাকায়-আপনার দোকানের ডিব্বা ডাব্বা, মিষ্টির গামলা সবই তো আস্ত আছে। তাহলে কী ফাটালাম। দোকানদার তার তরমুজের বিচির মত দাঁত বের করে হাসতে হাসতে বলে-তুমি কিন্তু মিয়া বড় দুষ্ট। খালি দুষ্টামি করো। আমি কি ডিব্বা ডাব্বা ফাটানির কথা কইছি? আমি কইছি নাম ফাটানির কথা। এই যে তোমার ছবি পত্রিকায় ছাপা হইল, এতে তোমার নাম ফাটল না? তুমি বিখ্যাত হইয়া গেলা না?
-ও, তাই নাকি? আমি বিখ্যাত হয়ে গেছি?
-অবশ্যই তুমি বিখ্যাত হইয়া গেছো। আর বিখ্যাত হইছো বইলাই আমি তোমার লগে একটু কোলাকুলি করতে চাই।
-ঠিক আছে, আসেন কোলাকুলি করি।
-আমারে একটু সময় দিতে হইবো যে?
-কেন?
-কারণ আছে।
দোকানদার দোকানে ঢুকে তার কর্মচারীকে কী যেন বলে। কর্মচারী দোকান থেকে বের হয়ে যায়। হয়তো কোন কাজে তাকে কোথাও পাঠানো হয়েছে। একটু পরেই কর্মচারী ফিরে আসে। তার মাথায় একটা টুল। টুলটা সাধারণ কোনো টুলের মত না। সাধারণ টুলের উচ্চতা যদি হয় দেড় হাত, এই টুলটার উচ্চতা কমপক্ষে আড়াই হাত। দোকানদার কর্মচারির কাছ থেকে টুলটা নিয়ে জনির সামনে রাখে। তারপর টুলটার উপর দাঁড়িয়ে জনিকে বলে-এইবার আসো, কোলাকুলিটা কইরা ফেলি। জনি এগিয়ে আসে এবং দোকানদারের সঙ্গে কোলাকুলি করে।
কোলাকুলি শেষে দোকানদার জিজ্ঞেস করে তারা কেন এসেছে। রবিন বলে-মিষ্টির দোকানে কেউ কি কেরোসিন তেল কিনতে আসে? দোকানদার সুপারিতে কটকট করে কামড় দিতে দিতে বলে-সবাই মিষ্টি খাও, ঠিক আছে। তবে জনিরে কিন্তু মিষ্টি দিতে পারমু না। জনির জন্য যেই সাইজের মিষ্টি দরকার, সেই সাইজের মিষ্টি নাই। আজকা রাইতে বানামু, কাইল আইসা খাইয়া যাইও। জনি অবাক হয়-আমার আবার কেমন সাইজের মিষ্টি দরকার? দোকানদার বলে-তোমার মুখ কত্ত উপরে! ছোট মিষ্টি মুখে দিলে মিষ্টিটা পেটে আইসা পৌঁছাইতে পৌঁছাইতেই তো গইলা যাইবো। তাই তোমার লাইগা বড় সাইজের মিষ্টি দরকার। শক্ত মিষ্টি দরকার। যাতে মুখ থেকে পেটে পৌঁছাইতে দেরি হইলেও পুরাপুরি না গলে। বুঝছ?
।। দশ।।
শাহেদ ভাইকে ফোন করে জনি। প্রথমে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানায়। তারপরই প্রকাশ করতে থাকে অভিমান-আপনি বলেছিলেন নিউজটা ছাপা হওয়ার আগেরদিন আমাকে ফোন করে জানাবেন। জানালেন না কেন? স্যাররা না জানালে তো আমি জানতেই পারতাম না। শাহেদ ভাই হাসেন-গতকাল একবার ভেবেছিলাম তোমাকে ফোন করবো। কিন্তু পরে ভাবলাম ফোন করে আগে থেকে জানিয়ে দিলে সারপ্রাইজটা থাকবে না। তোমাকে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্যেই জানাইনি। আর স্যাররা তোমাকে না জানালে তুমি জানতে পারতে না, এটা ঠিক না। কেউ না কেউ জানাত। একটা জাতীয় দৈনিক লক্ষ লক্ষ মানুষ পড়ে। তোমার পরিচিতদের মধ্যে কারো না কারো চোখে নিউজটা পড়তই।
-যদি বাইচান্স না পড়ত?
-আরে, পড়তই। না পড়লে আমি জানাতাম। আমি বিকেল পর্যন্ত অপেক্ষা করতাম। এরমধ্যে তুমি ফোন না করলে ধরে নিতাম তুমি পেপারটা পাওনি। আমি ফোন করতাম।
-আপনি আমাদের বাসায় কবে আসবেন? আব্বু আপনাকে খুব দেখতে চেয়েছে।
-আসবো আসবো। একদিন হুট করে চলে আসবো। আগে থেকে জানিয়ে আসলে তো সারপ্রাইজ থাকলো না। জনি, আমার জরুরী একটা কল এসেছে। তোমার সাথে একটু পরে কথা বলি?
জনি লাইন কেটে দেয়। এসময় বাইরে মানুষের আনাগোনা শোনা যায়। জনি জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখে দুই তিনটা ছেলে দাঁড়ানো। ছেলেগুলো এই এলাকারই। জনির সমবয়সী। তাদের সঙ্গে জনির প্রায়ই দেখা হয়, কিন্তু কথা হয় না। এছাড়া ছেলেগুলোকে তার কাছে ততটা সুবিধারও মনে হয় না। জনি বাইরে বের হয়। জিজ্ঞেস করে কার কাছে এসেছে। তারা জানায় জনির কাছেই এসেছে। জরুরী কী আলাপ নাকি আছে। জনি সবাইকে বারান্দায় বসায়। জানতে চায় কী আলাপ। ছেলেগুলোর মধ্যে একটা ছেলে বেশ কালো। আফ্রিকার মানুষদের মত। তবে চেহারায় ভদ্রতার ছিটেফোঁটাও নেই। কেমন যেন বজ্জাত বজ্জাত ভাব।
-আমরা তোমার কাছে একটা প্রস্তাব নিয়ে এসেছি। কালো ছেলেটা বলে।
-কী প্রস্তাব?
-তুমি যদি আমাদের প্রস্তাবে রাজি হও, তাহলে তোমাকে খুব ভালো একটা পুরষ্কার দেবো। পুরষ্কারটা কতটা ভালো…
-পুরষ্কারের কথা পরে হবে। আগে শুনি প্রস্তাবটা কী।
-বলবো। আসলে তোমার কথা আমাদের মাথায় আসত না। আজ পত্রিকায় তোমাকে নিয়ে রিপোর্ট ছাপার পরই তোমার কথাটা মাথায় আসল আরকি। রিপোর্টটা কিন্তু ভালো হয়েছে। ছবিতে তোমাকে খুবই সুন্দর লাগছিল। আমরা খুব মন দিয়ে পড়েছি রিপোর্টটা। আমি তো পরপর তিনবার পড়ে ফেলেছি।
-ধন্যবাদ। এখন প্রস্তাবটা শুনি।
-আমাদের একটা কাজ করে দিতে হবে।
-আমি তোমাদের কাজ করে দেবো? কী কাজ? আমি তো তেমন কোন কাজ পারি না।
-তেমন কোন কাজ না পারলেও এই কাজটা অবশ্যই তুমি পারবে। এটা তোমারই কাজ। আমরা কেউ পারবো না। যদি পারতাম তাহলে কি তোমার কাছে আসতাম? তোমাকে পুরস্কার দিতে চাইতাম? এবার বলি কাজটা কী। আমাদের পাড়ায় খুব কৃপণ একজন মানুষ আছে। তার ফলের বাগান ফলে ভরা। কিন্তু কাউকে দেয় না। গতকাল তার আমের বাগান থেকে আমি একটা ফল পেড়েছিলাম, আমাকে খুবই গালাগালি করেছে। তাই আমি তার উপর প্রতিশোধ নিতে চাই।
-কী রকম প্রতিশোধ?
-তার আমের বাগান খালি করে ফেলতে চাই। আর কাজটা আমরা করতে চাই রাতেরবেলা।
-আমাকে আম পেড়ে দিতে হবে, এই তো?
-আরে না, তোমাকে আম পেড়ে দিতে হবে না। আম আমরাই পাড়বো। শোনো, এই কিপ্টে লোকটা সারারাত বাগান পাহারা দেয়। বাদুড়কেও একটা আম খেতে দেয় না। চোর ডাকাত কোনকিছুকেই সে ভয় পায় না। বাগানের আশপাশে কোনোকিছু নড়াচড়া করলেই সে লাঠি নিয়ে তেড়ে যায়। তবে সে একটা জিনিসকে ভয় পায়। আমরা এই সুযোগটা কাজে লাগাতে চাই।
-জিনিসটা কী?
-ভূত।
-ভূত!
-হ্যাঁ, ভূত। লোকটা ভূতকে ভয় পায় বলেই আমরা তোমার কাছে এসেছি। তোমার যা হাইট, তাতে তুমি যদি সাদা একটা কাপড় পরে রাতে তার সামনে গিয়ে দাঁড়াও, সে হয় দৌড়ে পালাবে, নয়তো পড়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলবো। আমরা যত খুশি আম পাড়বো। বিক্রি করবো। খাবো। তোমাকেও খেতে দেবো। এছাড়া পুরষ্কার তো পাবেই।
ছেলেটার প্রস্তাব হজম করতে একটু সময় নেয় জনি। তারপর বলে-আমি লম্বা বলে তোমরা আমাকে ভূত সাজাতে চাইছো, তাই না? ছেলেটা হাসিমুখে বলল-জ্বি জ্বি। জনি কথা চালিয়ে যায়-আমি না হয় ভূত সাজলাম। কিন্তু তোমরা নিশ্চয়ই জানো ভূতেরা ঘাড় মটকায়। জানো না? সবাই সমস্বরে বলল-জানি। যেহেতু জানো, সেহেতু এখানে তোমাদের আর দেরি করা উচিত হবে না। যদি আস্ত ঘাড় নিয়ে বাড়ি ফিরতে চাও, তাহলে পালাও। কালো ছেলেটা চেহারা বিচ্ছিরি করে বলল-মানে কী? মানে কী বুঝতে পারছো না? আমি এখন তোমাদের ঘাড় মটকাবো। এমনভাবে মটকাবো যে, মুখ চোখ নাক চলে যাবে পেছন দিকে। আর পেছনের দিকটা চলে আসবে সামনে।
ছেলেগুলো বসা থেকে দাঁড়িয়ে গেল। কালো ছেলেটার চেহারায় হিং¯্রতা ভর করল। সে বারান্দা থেকে নামতে নামতে বলল-এই অপমানের প্রতিশোধ আমরা নেবো। জনি বিদ্রƒপের হাসি হাসল-আরে যা যা। প্রতিশোধ যখন নিবি তখন বলিস। আগে থেকে গলাবাজি করে লাভ নেই। তবে আরেকদিন যদি এই টাইপের প্রস্তাব নিয়ে আসিস, তাহলে তোদের ঘাড় আমি শিওর মটকাবো। দুদিন পরের ঘটনা। জনি বিকেলে ঘুরতে বেরিয়েছে। ঘুরতে ঘুরতে বাড়ি থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে চলে গেল। তখন সন্ধ্যা হতে আর বেশি সময় বাকি নেই। বিশ মিনিটের মধ্যেই হয়তো মাগরিবের আযান পড়বে। রাস্তায় কালো ছেলেটার সাথে দেখা। জনির ভেতরে একটা মোচড় মারল। ছেলেটা যদি এখন তার উপর প্রতিশোধ নেয়? তাকে এখন কে বাঁচাবে?
ছেলেটা জনির দিকে একবার তাকায়। তারপর পাশ কাটিয়ে চলে যায়। জনি ধরে নেয় বিপদ কেটে গেছে। কিন্তু বিপদ আসলে কাটে না। ছেলেটা একা জনির সঙ্গে মারামারি করে পারবে না, তাই অন্যদের আনতে গিয়েছিল। একটু পরেই ছয় সাতজনকে নিয়ে এসে জনির পথ রোধ করে। জনি মেইনরোড থেকে নেমে চিকন একটা পথ ধরে দৌড়াতে থাকে। ছেলেগুলোও তার পিছু নেয়। জনি যদি ঠিকমত দৌড়াতে পারত, তাহলে ছেলেগুলো থেকে সে পঞ্চাশ হাত এগিয়ে থাকতে পারত। কারণ ওদের পায়ে ˜িগুণ তিনগুণ লম্বা তার পা। কিন্তু সে ঠিকমত দৌড়াতে পারছে না গাছের জন্যে। এই চিকন পথের দুইপাশে অসংখ্য গাছ। আর গাছগুলোর ডাল ছড়িয়ে আছে পথের উপর। জনির মাথা সেইসব ডালে বাড়ি লাগছে। তাই সে নুয়ে নুয়ে দৌড়াচ্ছে। আর এভাবে দৌড়াচ্ছে বলেই দৌড়ে তত গতি নেই।
দৌড়াতে দৌড়াতে জনি যে এলাকায় চলে এসেছে, এদিকে সে আগে কখনোই আসেনি। তাই এই এলাকার কোথায় কী আছে, তার জানা নেই। হঠাৎ জনির সামনে পড়ে একটা খাল। খালের পানিতে তীব্র স্রােত। পড়লে খড়কুটোর মত ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। জনি বুঝে ফেলে, ছেলেগুলো জেনেশুনেই তাকে দৌড়াতে দৌড়াতে এদিকে নিয়ে এসেছে। খালপাড় এসে যখন সে আর সামনে যেতে পারবে না, তখন সবাই মিলে পেটাবে। পিটিয়ে হাত পা ভেঙে খালের পানিতে ফেলেও দিতে পারে। জনি খালের পাড়ে দাঁড়িয়ে গেলে ছেলেগুলো হাসতে হাসতে তার দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। জনি শেষবারের মত খালের প্রস্থটা দেখে নেয়। তারপর তার বাঁশের মত লম্বা লম্বা পা দিয়ে একটা লাফ মারে। একলাফে পাড় হয়ে যায় খাল। কালো ছেলেটাসহ আরো দুজন তার দেখাদেখি লাফ মারতে গিয়ে পড়ে যায় খালের মাঝখানে।
।। এগার।।
পরদিন ক্লাসে গিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেয় জনি। জিতু তো তার দিক থেকে চোখ ফেরাতেই পারে না। মার্বেলের মত গোল গোল চোখে তাকিয়ে থাকে তো থাকেই। জনি জানে কেন জিতু এভাবে তাকিয়ে আছে। তবু জিজ্ঞেস করে-কীরে, কী দেখছিস? জিতু বলে-আমি তোর সাহস দেখে অবাক হয়ে যাচ্ছি। আমরা এতো বছর ধরে এই স্কুলে পড়েও যে কাজটা করতে পারেনি, তুই নতুন এসেই সেটা করে ফেললি? তবে বেশি সাহস কিন্তু ভালো না। এখনও তো স্যাররা তোকে দেখেনি। দেখলে অবস্থা খারাপ করে দেবে। এখনও সময় আছে, চিন্তা করে দেখ কী করবি। স্যাররা দেখলে তোকে ঝাড়বেই। ক্লাস থেকেও বের করে দিতে পারে।
-এক গাদা কথা বলে ফেললি। অথচ কী হয়েছে সেটাই বুঝতে পারলাম না।
-তুই এটা কী পরে এসেছিস?
-কী আবার? প্যান্ট।
-এটা প্যান্ট?
-প্যান্ট না তো কী? লুঙ্গি?
-বুঝলাম প্যান্ট। কিন্তু ফুলপ্যান্ট তো না। হাফপ্যান্ট। বড়জোর থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট। এই স্কুলের কাউকে কোনদিন থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট পরে ক্লাসে আসতে দেখেছিস? হেডস্যার বহুবছর আগেই নিয়ম করে দিয়েছেন একমাত্র শার্ট প্যান্ট ছাড়া আর কোন পোশাক পরে স্কুলে আসা যাবে না।
-কিন্তু কারো যদি প্যান্ট না থাকে, তাহলে সে কী করবে? স্কুলে আসবে না?
-প্যান্ট না থাকে মানে? তুই কি বলতে চাচ্ছিস তোর প্যান্ট নেই?
-শুধু বলতে চাচ্ছি না, ডাইরেক্ট বলেই ফেলছি আমার প্যান্ট নেই। থাকলেও স্কুলে পরে আসার মত নেই। দুইটা প্যান্ট ময়লা হয়ে আছে। এতো ময়লা প্যান্ট পরে স্কুলে আসলে তোরা আমাকে তোদের পাশে বসতে দিতি না। আরেকটা প্যান্টের কোমর বেশ টাইট হয়। আরেকটা প্যান্টের…
-থাম। ঐসব প্যান্টের কথা বাদ দে। গতকাল যে প্যান্টটা পরে এসেছিলি, সেটা পরে আসলেই তো পারতি।
-এই প্যান্টটা এখন দর্জির দোকানে আছে। মেরামত করতে দিয়েছি।
-কেন, কী হয়েছে?
জনি এবার গতকালের তাড়া খাওয়ার ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলে-যখন আমি খালটা পাড় হওয়ার জন্যে লাফ দিলাম, শুনলাম ফড়াৎ করে একটা আওয়াজ হলো। কিসের আওয়াজ, কেন হলো আওয়াজটা-এইসব নিয়ে ভাবার টাইম তখন ছিল না। কিছুদূর এসে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে হাঁপাচ্ছিলাম। তখন ছোট ছোট তিনটা ছেলে আমার দিকে তাকিয়ে মিটমিট করে হাসছিল। আমি বুছতে পারছিলাম না কেন হাসছে। জিজ্ঞেস করলাম কী হয়েছে। তারা আঙুল দিয়ে আমার প্যান্ট দেখাল। দেখি প্যান্টের সেলাই ফেটে গেছে। তার মানে ফড়াৎ করে যে আওয়াজটা হয়েছিল, সেটা প্যান্ট ফাটার আওয়াজই ছিল। আমার তো তখন লজ্জায় মরে যাওয়ার দশা।
জনির লজ্জায় মরে যাওয়ার দশা হলেও জিতুর মরে যাওয়ার দশা হয় হাসতে হাসতে। প্যান্ট ফাটার দৃশ্যটা যে যতই কল্পনা করে, ততই তার হাসির গতি বাড়তে থাকে। অবশেষে অনেক ধমকিয়ে ধামকিয়ে তার হাসি থামায় জনি। বলে-সবগুলো প্যান্ট অকেজো হয়ে যাওয়ায় আমি কোন প্যান্টই পাচ্ছিলাম না পরে আসার জন্যে। হঠাৎ আলনার কাপড় সরাতে গিয়ে দেখি ভাইয়ার একটা পুরনো প্যান্ট। প্যান্টটা ভাইয়ার একটু লম্বা হয়। তাই ভাইয়া এটা পরে না। আমি পরে ফেললাম। কিন্তু পরার পর দেখি প্যান্টটা আর ফুলপ্যান্ট নেই। হয়ে গেছে থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট। জিতু উচ্চস্বরে হাসতে হাসতে বলে-লম্বার জন্যে যে প্যান্ট বড় ভাই পরতে পারে না, ছোট ভাইয়ের সেই প্যান্ট লম্বা তো হয়ই না, হয়ে যায় থ্রি কোয়ার্টার। কেউ আমাকে ধর। একটু শান্তিমত হাসি।
জিতুর আর শান্তিমত হাসা হয় না। ক্লাসের ঘণ্টা পড়ে গেছে। জনি ক্লাসে ঢুকে এমন একটা জায়গায় বসে, যেখানে স্যার যাবেন দূরের কথা, স্যারের চোখও যাবে না। স্যারের চোখের আড়ালে থাকাটা আজ তার জন্যে জরুরী। কারণ স্যারের হাতে ধরা পড়লে প্যান্ট ফাটার ঘটনাটা পূনঃপ্রচার করতে হবে। তখন তো শুধু জিতু হেসেছে, এখন হাসবে পুরো ক্লাস। তাকে আজীবনের জন্যে জোকার হয়ে যেতে হবে। স্যার রোল কল করে সবার দিকে এক ঝলক তাকালেন। জনি স্বাভাবিক থাকল। তাই স্যারের চোখ তার উপর আটকালো না। সে মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে গেল পার পেয়ে গেছে। আর এই স্যারের হাতে ধরা না খেলে অন্যান্য স্যারের হাতে ধরা খাওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই কম। কারণ প্রথম ক্লাসটা যিনি নেন, তিনিই বেশি খেয়াল করেন কে কী পরে এলো।
কথায় বলে-যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই রাত হয়। স্যার প্রথমে সামনের বেঞ্চের একজনকে পড়া জিজ্ঞেস করলেন। তারপর তৃতীয় বেঞ্চের একজনকে। এরপর কী মনে করে যেন চলে গেলেন জনির কাছে। জনি দু চারটা বাক্য ঠিকঠাকই বলল। তারপরই বাধিয়ে বসল গন্ডগোল। স্যার রেগে গেলেন-এই সামান্য পড়াটাও শিখে আসতে পারো না? দাঁড়াও, বেঞ্চের উপর দাঁড়াও। জনি কাঁচুমাচু করতে লাগল। এখন বেঞ্চের উপর দাঁড়ালে স্যার পড়ার কথা ভুলে গিয়ে শুধু তার প্যান্ট নিয়েই কথা বলবেন। তার মুখ থেকে আসল ঘটনা বের না করে ক্ষান্ত হবেন না। তারপর কতক্ষণ ধরে যে হাসাহাসি চলবে! হয়তো অন্যান্য ক্লাসের ছাত্ররাও এসে যোগ দেবে হাসিতে।
স্যারের আদেশ মানা হচ্ছে না দেখে স্যার গর্জন করে উঠলেন-এই বেয়াদব ছেলে, তোমাকে আমি বেঞ্চের উপর দাঁড়াতে বললাম না? এবার জনি ভয় পেয়ে এক লাফে উঠে গেল বেঞ্চে। কিন্তু সোজা হয়ে দাঁড়াতে গিয়েই ঘটিয়ে বসল অঘটন। এমনিতেই এই রুমের পাটাতনটা একটু নড়বড়ে ছিল। অনেক দিনের পুরনো হলে যায় হয়। জনির মাথার গুতো লেগে আস্ত পাটাতনটা খসে পড়ল ছাত্র ছাত্রীদের মাথায়। বাদ গেল না স্যারের মাথাও। ক্লাসজুড়ে লেগে হাঙ্গামা। এই হাঙ্গামা ছড়িয়ে পড়ল পুরো স্কুলে। হেডস্যার এসে খোঁজ নিলেন কেউ বড় কোন আঘাত পেয়েছে কিনা। না, কেউই তেমন কোন আঘাত পায়নি। কারো কারো শরীরের চামড়া একটু ছিলে গেছে।
স্যাররা চলে যাওয়ার পর শুরু হয় ঝড়ো হাসি। রবিন একটা কথা তিনবার বলতে চেয়েও বলতে পারছে না। হাসির জন্যে কথা আটকে যাচ্ছে। চতুর্থবারের মাথায় সে বলতে পারে-আজতো শুধু আমাদের উপর পাটাতন ভেঙে পড়েছে। তুই যদি আরেকটু লম্বা হতো, তাহলে আমাদের উপর আকাশ ভেঙে পড়ত। কারণ তখন তোর মাথা গিয়ে আকাশে গুঁতো খেত। হা হা হা। জিতু বলে-যত দিন যাচ্ছে ততই একটা কবিতা আমার খুব প্রিয় হয়ে যাচ্ছে। কোন কবিতাটা জানিস? ঐযে ঐ কবিতাটা-‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে, কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে।’ কবিতাটা আমার প্রিয় হওয়ার কারণ হচ্ছে, কবিতাটা পড়লেই জনির কথা মনে পড়ে। অবশ্য এরজন্যে কবিতার একটা ওয়ার্ড চেঞ্জ করে নিতে হয়।
-কোনটা?
-‘কাজে’ ওয়ার্ডটা। চেঞ্জ করে নিলে কবিতাটা হয়-‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে, কথায় না বড় হয়ে সাইজে বড় হবে।’ হা হা হা।
জনি এখন জিতুর কথার দাঁতভাঙা জবাব দিতে পারত। কিন্তু সে অস্বস্তিতে আছে বলে কাউকে কিছু বলতে চাচ্ছে না। জনি অস্বস্তিতে আছে তার মাথা নিয়ে। পাটাতনে বাড়ি লেগে মাথায় হালকা ব্যথা পেয়েছে। তবে অস্বস্তি এই ব্যথার জন্যে না। তার অস্বস্তির কারণ-মাথায় কী যেন হাঁটছে। এমনভাবে হাঁটছে, মনে হচ্ছে উকুন। কিন্তু তার চুলে তো উকুন নেই! নিয়মিত উকুননাশক শ্যাম্পু দিয়ে সে মাথা ধোয়। তাহলে কী হতে পারে? জনি জিতুদের কাছ থেকে একটু দূরে গিয়ে মাথা ঝাড়া দেয়। আর অমনি চুলের ভেতর থেকে চার পাঁচটা উইপোকা খসে পড়ে মাটিতে। পাটাতনে উইপোকা ছিল কে জানত! জনি উইপোকাগুলো লুকানোর চেষ্টা করেও পারে না। জিতুরা ঠিকই দেখে ফেলে।
।। বারো।।
পরদিন কাপড় দিয়ে মাথা প্যাঁচিয়ে ক্লাসে আসে জনি। জিতু এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করে-মাথায় নিশ্চয়ই বরফ দিয়েছিস? মাথা বেশি ব্যথা করছে নাকি? জনি হাতের আঙুলের পেট দিয়ে মাথার কাপড়ে চাপ দিতে দিতে বলে-মাথা ব্যথাও করছে না, বরফও দেইনি। কাপড় প্যাচিয়েছি অন্য কারণে। কারণটা এখন বলা যাবে না। স্কুল ছুটি হোক, তখন শুনিস। স্কুল ছুটি হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করার ধৈর্য নেই দুষ্টু জিতুর। সে এখনই মাথার কাপড়টা সরাতে চায়। কিন্তু চাইলেই তো শুধু হবে না। জনির মাথা তো নাগাল পেতে হবে। কীভাবে তার মাথাটা নিচু করা যায়, সে ভাবতে থাকে। ভাবতে ভাবতে যুৎসই একটা বুদ্ধি পেয়ে যায়।
জিতু নিজের কলমটা জনির সামনে ফেলে দেয়। জনি অন্যদিকে তাকিয়ে কথা বলার কারণে কলমটা দেখতে পায় না। জিতু এবার জনির কাছ থেকে একটু দূরে সরে গিয়ে বলে-জনি, তোর পায়ের কাছে এটা কী দেখা যাচ্ছে? কলম নাকি? জনি নিচের দিকে তাকিয়ে বলে-হ্যাঁ, কলমই তো। কার কলম এটা? আর একটু হলেই তো পাড়া মারতাম। জনি এবার কলমটা তোলার জন্যে নিচু হয়। জিতু দ্রুত তার কাছে এসে টান দিয়ে মাথার কাপড়টা নিয়ে নেয়। সবাই দেখতে পায় জনির মাথায় কোন চুল নেই। কামিয়ে ফেলেছে। জিতু অবাক হয়ে জানতে চায়-কীরে, এটা কী করেছিস? রবিন বলে-তোর মাথায় ঠাটা পড়েছিল নাকি? ঠাটা বুঝিস? বজ্রপাত।
-কামিয়ে ফেলেছি।
-কামিয়ে ফেলেছিস, তাতো দেখতেই পাচ্ছি। কিন্তু কামালি কেন? তোর মত দামড়া ছেলে মাথা টাক করে?
-চুলের ভেতর অনেকগুলো উইপোকা ঢুকে গিয়েছিল। একটা ফেললে আরেকটা বের হয়, আরেকটা ফেললে আরেকটা বের হয়। সবাই বলল পরবর্তীতে নাকি সমস্যা হতে পারে। তাই মাথা সাফ করে ফেললাম।
-খুব ভালো করেছিস। তবে এখন থেকে আসগর মিয়ার দোকানে গেলে একটু সাবধানে যাস।
-কেন?
-আসগর মিয়ার দোকানের কাছেই একটা বেলগাছ আছে, নিশ্চয়ই দেখেছিস?
-তো?
-যেহেতু বেলগাছ আছে, তাই সাবধান থাকতেই হবে। জানিস না, ন্যাড়াদের বেলতলায় যাওয়া মানা?
জনি কিছু বলে না। তার মনটা ভালো নেই। স্কুলে আসার সময় একটা খারাপ খবর শুনে এসেছে। খবরটা শোনার পর থেকেই তার অস্থির লাগছে। মনে হচ্ছে খুব বড় কোন অপরাধ করে ফেলেছে। জনি যখন দেবদারু গাছটার নিচে আসে, তখন সেই কালো ছেলেটার এক বন্ধুর সাথে দেখা হয়ে যায়। ঐদিন সেও জনিকে দৌড়িয়েছিল। জনি তাকে দেখেই হাঁটার গতি বাড়িয়ে দেয়। ছেলেটা তাকে ডাক দেয়। তার গলার স্বর শুনেই জনির ভয় কেটে যেতে থাকে। খুব মোলায়েম স্বর। বন্ধুসুলভ। এই স্বরে কেউ কাউকে ডাকার পর সে আর তাকে মারতে পারে না, গালাগালি করতে পারে না। এই স্বরে কেবল এক বন্ধুই আরেক বন্ধুকে ডেকে থাকে।
জনি দাঁড়ায়। ছেলেটা তার কাছে যায়। গিয়ে বিনীতভাবে বলে-তুমি সেলিমকে ক্ষমা করে দিও ভাই। তুমি ক্ষমা না করলে হয়তো সে কোনদিনই সুস্থ হবে না। জনি জিজ্ঞেস করে-সেলিম কে? ছেলেটা বলে-আমার বন্ধু। তুমি তাকে চেনো। তোমাদের বাড়িতে গিয়েছিল। আবার সেদিন তোমাকে দৌড়িয়েছিল। কালো করে। কী হয়েছে ওর? তোমার দেখাদেখি খাল পাড় হওয়ার জন্যে লাফ দিতে গিয়ে খালে পড়ে গিয়েছিল। তখন চোখা একটা বাঁশের কঞ্চি তার পায়ে ঢুকে যায়। ডাক্তার বলেছে কঞ্চিটা তার পা থেকে বের করতে বড় একটা অপারেশন করতে হবে। আর এই অপারেশনের জন্যে পাঁচ লাখ টাকা তো লাগবেই। এতো টাকা যোগাড় করার মত সামর্থ সেলিমের বাবার নেই। অপারেশন করতে না পারলে হয়তো পঁচন ধরবে। শেষে পাটা কেটেও ফেলে দিতে হতে পারে।
এই কদিনে বিছানার সাথে মিশে গেছে সেলিম। সারাদিন শুয়ে থাকে। ঘুমুতে পারলে হয়তো একটু ভালো লাগত। কিন্তু ঘুমও আসে না। সারাদিন দুরন্তপনা করে বেড়ানো সেলিমের কাছে হাসপাতালের বেডটাকে হাজতের চেয়েও কষ্টের জায়গা বলে মনে হয়। পায়ের জখমটা এতো মারাত্মক না হলে সে কবে এখান থেকে পালিয়ে যেত! দশটা ডাক্তার পিছু পিছু দৌড়িয়েও তাকে ধরতে পারত না। হাসপাতালের জানালা দিয়ে একটা খেলার মাঠ দেখা যায়। বিকেল হলেই কিছু ছেলে এখানে খেলতে আসে। সেলিম তাদের খেলা দেখে আর ভাবে সে হয়তো আর কোনদিন খেলতে পারবে না। হয়তো হাঁটতেও পারবে না আগের মত। হাঁটতে হবে ক্রাচে ভর করে, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। সেলিমের চোখের পানিতে বালিশ ভিজে যায়।
-সেলিম ঘুমিয়েছো?
চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকা সেলিমকে জিজ্ঞেস করে কেউ। সেলিম চোখ খোলে। দেখে জনি দাঁড়িয়ে আছে। সেলিম চোখ রগড়ায়। কাকে দেখছে সে? জনিই তো? সেলিম দৃষ্টিহীনদের মত জিজ্ঞেস করে-কে? উত্তর আসে-আমি জনি। তুমি এখন কেমন আছো সেলিম? সেলিম কোন কথা না বলে দু হাত বাড়িয়ে দেয়। জনি তার কাছে এলে সে তাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে-আমার সব শেষ হয়ে গেছে জনি, আমার সব শেষ হয়ে গেছে। তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিও। আমি তোমার উপর অনেক অন্যায় করে ফেলেছি। জনি সেলিমের কান্না থামিয়ে তার চোখ মুছে দিতে দিতে বলে-তোমার কিচ্ছু হবে না। কিচ্ছু হবে না তোমার।
-আমাকে মিথ্যে সান্ত¦না দিচ্ছ জনি?
-মিথ্যে সান্ত¦না সেলিম। দেখো, ইনশাআল্লাহ তোমার কিছুই হবে না। আমরা থাকতে তোমার এতো বড় ক্ষতি হয়ে যাবে, এটা হয় নাকি! তুমি নিশ্চিন্ত মনে আল্লাহকে ডাকো। দেখবে সময়মত তোমার অপারেশনের সব ব্যবস্থা হয়ে গেছে।
পরদিন স্কুলে গিয়ে সেলিমের ঘটনাটা জিতুকে বলে জনি। জিতু বলে-সেলিমের এই অবস্থার জন্যে তুই দায়ী, এমনটা মনে করা কিন্তু বোকামি। এটা একটা অ্যাক্সিডেন্ট। এছাড়া তুই তো আর তাকে ধাক্কা দিয়ে খালে ফেলে দিসনি। সেদিন সে যদি খালে না পড়ত আর তোকে যদি ধরতে পারত, তাহলে তোর কী অবস্থা হতো, ভাব। এতোকিছুর পরও তুই তাকে দেখতে গেছিস, তাকে ক্ষমা করে দিয়েছিস, এটা তোর উদারতা। এখানেই বিষয়টা শেষ হওয়া উচিত। কিন্তু তুই তাকে বলে এসেছিস সময়মত নাকি তার অপারেশনের ব্যবস্থা হয়ে যাবে। এখন তো সে নতুন করে আশাবাদী হবে। তুই কীভাবে তার আশা পূরণ করবি? খামোখা কেন তাকে কথা দিতে গেলি?
-আমরা কি তার জন্যে কিছু করতে পারি না?
-কী করবো? কী করার আছে আমাদের?
-আমরা যদি তার অপারেশনের কথা বলে স্কুলের সবার কাছ থেকে টাকা ওঠাই?
-এটা সম্ভব না দুই কারণে। প্রথম কারণ-সেলিম এই স্কুলের ছাত্র না। এই স্কুলের ছাত্র হলে সবাই যেভাবে হাত খুলে দান করত, সেলিমের জন্যে সেভাবে করবে না। আর হাত খুলে দান না করলে বেশি টাকা উঠবে না। সারা স্কুল থেকে যদি মাত্র বিশ পঞ্চাশ হাজার টাকা ওঠে, তাহলে তা দিয়ে তো আর অপারেশন হবে না। ওষুধপত্র কিনতেই এই সামান্য টাকা চলে যাবে। দ্বিতীয় কারণ-এলাকায় সেলিমের ইমেজ ভালো না। সবাই তাকে বখাটে হিসেবে জানে। তার চিকিৎসার জন্যে কেউ দান করতে চাইবে না। তার জন্যে টাকা ওঠাতে গেলে তোর ইমেজও খারাপ হয়ে যেতে পারে। সবাই ভাবতে পারে তুইও সেলিমের মতই বখাটে। এই জন্যেই তার প্রতি তোর এতো দরদ।
জিতুর কথায় হতাশ হয় জনি। তবে হাত পা গুটিয়ে বসে থাকার সিদ্ধান্ত সে নিতে পারে না। কীভাবে নেবে? তার ভরসা পেয়ে সেলিমের মুখে হাসি ফুটেছে। এই হাসি সে ফুরিয়ে যেতে দেবে? কক্ষনো না। সেলিমের অপারেশনের টাকা সে যোগাড় করবেই।

দয়াকরে লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০১৮-২০১৯ নবরঙ
Design BY NewsTheme