লেখা আহবান
প্রিয় লেখক বন্ধু, আপনার লেখা সবচেয়ে সুন্দর উপন্যাস, সায়েন্স ফিকশন, ভ্রমণকাহিনী, ফিচার, স্বাস্থ্য কথা ইত্যাদি পাঠিয়ে দিন এই মেইলে– noborongpotrika@gmail.com

ছড়া স্লিপ- ৫, ৬

জগলুল হায়দার

ছন্দ জানা মন্দ না

আগের স্লিপে জানলাম বাংলা ছড়ার তিন ছন্দ যথাক্রমে- অক্ষর বৃত্ত, মাত্রা বৃত্ত ও স্বর বৃত্ত। নাম তো জানলাম এখন জুরুরি হইল তাদের সঙ্গে পরিচয়। পরিচয় মানে, ছন্দগুলার কার কি চরিত্র-বৈশিষ্ট তাই জানা। প্রথমেই অক্ষর বৃত্ত।

বাংলা তিন ছন্দের মধ্যে প্রথমেই যে ছন্দের নাম আসে সেইটা এই অক্ষর বৃত্ত। অক্ষর বৃত্ত বেশ পুরানা ছন্দ। সেই অর্থে ছন্দশাস্ত্রে এইটা খানদানী ছন্দ। অক্ষর বৃত্ত ছন্দকে আমরা এই নামেই ডাকুম। তারপরও জানার স্বার্থে এর অন্য নামগুলাও একটু শুনি। এর অন্য দুইটা প্রধান নাম হইল অক্ষর মাত্রিক ও বর্ণ মাত্রিক। এর আরো কিছু নাম আছে। সেইসব বলার আগে বাংলার এক প্রখ্যাত ছন্দবিশারদের নাম বলি। তিনি প্রবোধচন্দ্র সেন। তার কথা বলছি এই কারণে যে অক্ষর বৃত্ত নামটা তারই দেয়া। অবশ্য তিনিই আবার একে যৌগিক ছন্দ নামেও ডাকতেন। আরেক বিখ্যাত ছন্দবিশারদ অমুল্যধন মুখোপাধ্যায় একে বলতেন তান প্রধান ছন্দ। রবীন্দ্রনাথ আবার এই ছন্দকেই কখনো সাধু ছন্দ আবার কখনো পয়ার জাতীয় বলছেন। তবে সবকিছু বিবেচনায় প্রবোধচন্দ্র সেন একসময় উপলব্ধি করেন যে অক্ষর বৃত্ত নামের মধ্যে এই ছন্দের চরিত্র-বৈশিষ্ট পুরাপুরি পষ্ট হয় না। তাই পরে তিনি একে মিশ্রকলা বৃত্ত নামে অভিহিত করেন। যাক নাম নিয়া এতো গ্যাঞ্জামে না গিয়া আমরা বরং খোদ ছন্দটাকেই চিনতে চেষ্টা করি। আর চিনতে পারলেই কাফি। কারণ চিনা বামুনের পৈতা লাগে না।

মাত্রা সংক্রান্ত আলোচনায় বলছিলাম প্রতিটা বর্ণই একটা মাত্রা। কথাটা আসলে এই অক্ষর বৃত্তের ক্ষেত্রেই একবারে- খাপে খাপ আম্বিয়ার বাপ। অর্থাৎ এই কথাটা মনে রাখা জুরুরি যে, অক্ষর বৃত্ত ছন্দে যতো অক্ষর ততো মাত্রা। এইবার কয়েকটা উদাহরণ দেখতে পারি-

ক) চিত্ত যেথা ভয় শূন্য উচ্চ যেথা শির/ জ্ঞান যেথা মুক্ত, যেথা গৃহের প্রাচীর।
(চিত্ত যেথা ভয় শূন্য (প্রার্থনা)/ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)
খ) হে দারিদ্র্য তুমি মোরে/ করেছ মহান/তুমি মোরে দানিয়েছ/ খ্রীস্টের সম্মান।
(হে দারিদ্র/ কাজী নজরুল ইসলাম)
গ) হাজার বছর ধরে/ আমি পথ হাঁটিতেছি/ পৃথিবীর পথে,/সিংহল সমুদ্র থেকে/ নিশীথের অন্ধকারে/ মালয় সাগরে।
(বনলতা সেন/ জীবনানন্দ দাশ)
ঘ) আমার আছে খুব অভিলাষ মাত্রা মেপে চলার/ ছড়ার স্লিপে ছন্দ আলাপ অনেক কথা বলার।
( তাৎক্ষনিক রচনা, নিবন্ধকার)

উপরোক্ত (উপর্যুক্ত) ৪টা কবিতা অক্ষর বৃত্ত ছন্দে লেখা। আমরা প্রতিটা কবিতার ক্ষেত্রেই দেখতে পাইতেছি এক অক্ষরে এক মাত্রা। আর সেই মাত্রাগুলা পর্ব ও চরণে সংস্থাপিত হইছে কবিতা ও ছড়ার শরীরে। এই যা, পর্ব আর চরণের কথা তো এখনো বলাই হয় নাই। সমস্যা নাই পরের স্লিপগুলাতে ছন্দ আলাপের মাঝেই সেই আলোচনাও ঢুকবো ইনশাআল্লাহ।

ছড়াস্লিপ- ৬

মাত্রার পুনঃযাত্রা

নানা ইস্যুর চাপে স্লিপে ফিরতে একটু দেরি হইল। ইতিমধ্যে স্লিপের জন্য বেশ কিছু অনুরোধ জমা হইছে। আয়তন বৃদ্ধির অনুরোধ তো আছেই। আগ্রহী ছড়াকারদের বলতে চাই, নানা ইস্যু আর কাজের চাপে মাঝেমধ্যে গ্যাপ গেলেও স্লিপ চলবো ইনশাআল্লাহ। আর স্লিপের আয়তন নিয়া সেই কথাই- স্লিপকে স্লিপের মতোই রাখতে চাই। তয় সবার কথা মাথায় রাইখা স্লিপ কখনো কখনো ডাবলে দিতে পারি। যাক ভূমিকার ভার এইখানেই শেষ। এইবার যাই আলাপে।

আগের স্লিপের অক্ষর বৃত্তের আলাপে বেশ কিছু প্রশ্ন আসছে। এইটা ভালোলাগার বিষয় যে অনেকই আগ্রহ নিয়া স্লিপ পড়তেছে। প্রতিটা আলাপেই আগ্রহী ছড়াকারদের এইসব কথা মাথায় থাকবো। যথাসম্ভব সেইসবের জবাবও থাকবো। আর এই চিন্তায় আজ মাত্রা নিয়া আরেকটু ডিটেলে কথা বলুম। সবার মনে আছে হয় তো, মাত্রা সম্পর্কে কিতাবি সংজ্ঞা দিতে গিয়া বলছিলাম- মাত্র হইল শব্দের ক্ষুদ্রতম একক। আর মাত্রার এই সঙ্গারে বিস্তার করছিলাম এইভাবে- ‘বর্ণ তথা একেকটি ধ্বনি চিহ্নের উচ্চারণ কালের পরিমাপ।’ অর্থাৎ একটি ধ্বনি চিহ্ন উচ্চারণ করতে স্বাভাবিকভাবে যতোটুক সময় লাগে সেইটাই মাত্রা। বাংলা স্বর ও ব্যাঞ্জন মিলায়া মোট ৪৯ টা বর্ণ। খিয়াল করলে দেখা যাইব এই বর্ণগুলার ( ং ঃ, ৎ, ঁ বাদে) উচ্চারণদৈর্ঘ বা উচ্চারণকাল এক। আরেকটা জিনিস মনে রাখতে হইব, বাংলায় স্বরবর্ণের ক্ষেত্রে একই বর্ণের হ্রস্ব ও দীর্ঘ রূপের বেলায় বর্ণটা হ্রস্ব না দীর্ঘ তা চিহ্নিত কইরা উচ্চারণ করা হয়। কিন্তু এইটা সেই বর্ণের মৌলিক উচ্চারণ নয়। যেমন স্বর-এ অ/ স্বর-এ আ। আবার হ্রস্ব-ই/ দীর্ঘ-ঈ। এমনি আরো আছে। কিন্তু এই বর্ণগুলার মৌলিক উচ্চারণ দিয়াই তাদের দৈর্ঘ তথা মাত্রা-মাপ নির্দিষ্ট। স্বর-এ অ মূলত অ আবার স্বর-এ আ মূলত আ। এই নিয়মে অন্যগুলাও। আবার বাংলায় কিছু সমুচ্চারিত বর্ণ আছে। সেইগুলাকে ফারাক করার জন্য তাদের উচ্চারণ উৎস বা রূপ বৈশিষ্টের নিরিখে আলাদা করা হয়। এইক্ষেত্রেও অইসব বর্ণের আগে বাড়তি কিছু শব্দ যুগ (যোগ) কইরা পড়তে হয়। যেমন তালু থিকা উদ্ভূত বইলা তালেবশ, কিম্বা দাঁতের থিকা উদ্ভূত বইলা দন্ত্যস। তেমনি ব-এর নিচের বিন্দুতে বয়সন-র। কিন্ত মনে রাখতে হইব বর্ণের ক্ষেত্রে এইসব শব্দগুলা দরকারি হইলেও মাত্রার ক্ষেত্রে এসব বর্জিত। অর্থাৎ তালেবশ- মূলত শ। দন্ত্যস- মূলত স। একইভাবে বয়সন-র স্রেফ র। ফলে দেখা যাইতেছে এইসব বর্ণের উচ্চারণদৈর্ঘও অন্য রেগুলার বর্ণের সমান। তাইলে মাত্রা আলোচনার প্রাথমিক স্তরে এইটা এখন পরিস্কার (খাস কইরা অক্ষর বৃত্তের জন্য) যে একটা বর্ণ বা অক্ষর কেন এক মাত্রা পায়। আবার বলতেছি, প্রতিটা অক্ষর এক মাত্রা পায় কারণ তাদের উচ্চারণ কাল সমান।

একটু উদাহরণ দিয়া দেখি-
কলম/মলম, সাগর/ডাগর, দিনরাত/ তিন রাত/ জিন দেশী/ ভিনদেশীে, শাজাহান/ বা জাহান ইত্যাদি। এই উদাহরণগুলা খিয়াল করলে অক্ষর ও অক্ষর বৃত্তের মাত্রা-মাপ সম্পর্কে আগের স্লিপে প্রশ্নকারী ছড়াকারদের ধারণা মোটামুটি পষ্ট হওয়ার কথা। তারপরও এই নিয়া সামনে আরো আলাপ চলবো ইনশাআল্লাহ।

[চলতি কথনরীতিতে লেখা]


দয়াকরে লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০১৮-২০১৯ নবরঙ
Design BY NewsTheme