লেখা আহবান
প্রিয় লেখক বন্ধু, আপনার লেখা সবচেয়ে সুন্দর উপন্যাস, সায়েন্স ফিকশন, ভ্রমণকাহিনী, ফিচার, স্বাস্থ্য কথা ইত্যাদি পাঠিয়ে দিন এই মেইলে– noborongpotrika@gmail.com
রিয়ার ট্রেন ভ্রমণ

রিয়ার ট্রেন ভ্রমণ

হুমায়ুন আবিদ

আলী হোসেন সাহেব বনবিভাগের একজন উর্ধতন কর্মকর্তা। বর্তমানে তিনি বান্দরবান জেলায় কর্মরত আছেন। স্ত্রী জোবায়দা খানম আর দুই মেয়ে নিয়ে আলী হোসেন সাহেবের সুখের সংসার। বড় মেয়ে রিয়া বান্দরবান জেলা স্কুলে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে আর ছোট মেয়ে দিয়ারবয়স চার বছর।

আলী হোসেন সাহেবের পৈত্রিক বাড়ি ঢাকার সাভারে। চাকুরিজনিত কারণে দীর্ঘ পনের বছর যাবত বান্দরবানে পরিবার নিয়ে বসবাস করছে।

রিয়ার বার্ষিক পরীক্ষার কিছুদিন বাকী। রিয়া তার বাবাকে বললো, বাবা এইবার বার্ষিক পরীক্ষার পর দাদুর বাড়ী বেড়াতে যাবো! কতদিন হয় দাদা-দাদু চাচ্চু আর ফুফিকে দেখিনা। তুমি কিন্তু না করতে পারবে না। 

বাড়ির কথা শুনে আলী হোসেন সাহেবের ভিতরটামোচড় দিয়ে উঠে। সময় সুযোগের অভাবে আজ চার বছর হয় বাড়িতে যাওয়া হয় না। সহসা সবার কথা মনে পড়াতে আলী হোসেন সাহেবের মনটা বেশ খারাপ হয়ে যায়।

রিয়া তার বাবার মনটা খারাপ দেখে বললো,

-কি হয়েছে বাবা, মনটা খারাপ কেনো।

-তোর দাদুবাড়ীর কথা খুব মনে পড়ে গেলোতো তাই।

-আমরা দাদু বাড়ি গেলে সবাই অনেক খুশি হবে।তোমারও মনটা ভালো হয়ে যাবে। চলনা সবাই মিলে দাদুবাড়ি থেকে ঘুরে আসি।

-তোর মায়ের সঙ্গে কথা বলে দেখি সে কি বলে।

-এইবার দাদুবাড়ি গেলে কিন্তু আমরা ট্রেনে চড়ে যাবো।

-হঠাৎ করে ট্রেনে চড়ার শখ হলো কেনো রে?

-জসিম স্যার সেদিন ক্লাসে ট্রেন ভ্রমণের উপর বাস্তব অভিজ্ঞতা দিয়ে রচনা লিখতে বলেছিলো। অনেকেই লিখলো। আমিতো আর ট্টেন ভ্রমণ করিনাই তাই লিখতে পারলাম না। এই নিয়ে জসিম স্যার আমাকে কতো কথা বললো, আমরানাকি ঢাকার মানুষ অথচ ট্রেনে চড়ি নাই এমন কথা শুনলে নাকি পাগলেও হাসবে। তাইতো ট্রেন ভ্রমণ করার খুব ইচ্ছে হয়েছে বাবা।

-আচ্ছা ঠিক আছে। আগে ভালোভাবে পরীক্ষাটা দাও। তারপরে কি করা যায় দেখা যাবে।

আলী হোসেন সাহেব রাত্রে স্ত্রী জোবায়দা খানমেরসাথে রিয়ার দাদু বাড়ি যাবার বিষয়টি নিয়ে নিয়েআলোচনা করলে জোবায়দা খানম বললো,দিয়ারজন্মের পরতো আর যাওয়াই হয়নি, অফিস থেকেযদি ছুটি নিতে পারো তাহলে চলো সবাই মিলেঘুরে আসি।

আলী হোসেন সাহেব পরেরদিন অফিসে গিয়ে কর্তৃপক্ষের সাথে ছুটির বিষয়ে আলোচনা করে এক মাসের জন্য ছুটির আবেদন করে।

দেখতে দেখতে রিয়ার বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হয়ে যায়। রাতে ভাত খেতে খেতে রিয়া তার বাবাকে বললো, দাদুবাড়ি কবে যাচ্ছি বাবা?

-সামনের বুধবার।

-সত্যি?

-সত্যি! সত্যি!! সত্যি!!!

রিয়া তার বাবার কথা শুনে খুশিতে আত্নহারা হয়েগেলো।

আলী হোসেন সাহেবের স্কুলজীবনের বন্ধু আজিম খান বাংলাদেশ রেলওয়ে চট্টগ্রামে কর্মরত আছেন।

আলী হোসেন সাহেব বন্ধু আজিম খানকে ফোন করে বললেন,

-আগামী ১০ তারিখ চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা যাওয়ার জন্য সূবর্ণ এক্সপ্রেস ট্টেনের ৪টি টিকেট কেটে রাখিস আমি ৯ তারিখ সন্ধ্যায় তোর বাসায় স্বপরিবারে আসছি ঢাকা যাওয়ার জন্য।

-ঠিক আছে বন্ধু চিন্তা করিস না আমি ব্যবস্থা করেরাখবো। 

আলী হোসেন সাহেব ৯ তারিখে সকাল সকাল অফিস থেকে বাসায় ফিরে প্রয়োজনীয় মালামালগুছিয়ে বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্য রওনা দেন। সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে আলী হোসেন সাহেব বন্ধু আজিম খানের বাসায় এসে উপস্থিত হন।

আজিম খান ও তার স্ত্রী অনেক দিন পর তাদের দেখে ভীষণ খুশি হয়ে আতিথেয়তায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

আলী হোসেন সাহেব ও তার স্ত্রী পরেরদিন সকালছয়টার দিকে আজিম খান ও তার স্ত্রীর কাছথেকে বিদায় নিয়ে চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনের উদ্দেশ্য রওনা দেন।

স্টেশনের ভিতর প্রবেশ করেই রিয়া তার বাবাকেজিজ্ঞেস করলো,

-বাবা ঐখানে এতো লোক লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছে কেনো?

-এরা ট্রেনের টিকেট কাটার জন্য দাঁড়িয়ে আছে।টিকেট ছাড়া ট্টেন ভ্রমণ যে দন্ডনীয় অপরাধ। 

-আমরা যে ট্রেনে যাব এরাও কি সেই ট্রেনের টিকেট কাটছে।

-সবাই না।

-তাহলে কোন ট্রেনের।

-ভিন্ন ভিন্ন ট্রেনের। ঐযে দেখো টিভি স্ক্রীনে বিভিন্ন ট্রেনের নামের সাথে কখন কোন ট্টেন ছেড়ে যাবেতা লিখা আছে।

রিয়া স্ক্রীনের দিকে তাকিয়ে বললো সত্যিইতো!

আরেকটু  সামনে এগিয়ে রিয়া বাবাকে জিজ্ঞেস করলো,

-সাদা পোশাক পরা  ঐ লোকগুলো দাঁড়িয়ে কিসের কাগজ দেখছে বাবা?

– এরা হল ট্রেন টিকেট এক্সামিনার মানে টিটিই।এদের কাজ হল টিকেট চেক করা। যাতে করে কেউ টিকেট ছাড়া প্লাটফর্মের ভিতরে প্রবেশ করতে না পারে।

-আমাদের টিকেট আছে বাবা?

-হ্যাঁ আছে।

স্টেশনের প্লাটফর্মে ডুকে রিয়া দেখলো বিশাল লন্বা ট্রেন। রিয়া বললো-

-বাবা আমরা কি এই ট্রেনেই যাবো

-হ্যাঁ।

-ট্রেন কেমনে চলে বাবা?

-ট্রেনের সামনে ইঞ্জিন লাগানো আছে। ট্রেনচালক সেই ইঞ্জিন চালু করলেই ট্রেন চলতে শুরুকরবে।

ট্রেনের বগীর সামনে গিয়ে রিয়া বলালো,

-টুপি মাথায় এরা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেকেনো?

-এরা হল ট্রেনের পরিচারক। এরা ট্রেনের যাত্রিদের বিভিন্ন বিষয়ে সহায়তা করে থাকে।যেমন কার সিট কোনটি, ট্রেনের দরজা খুলে দেয়া, জানালা খুলে দেয়া জানালা বন্ধ করে দেয়া ইত্যাদি।

ট্রেনের ভিতর উঠেই রিয়া দেখলো সামনে টিভি চলছে, উপরে ফ্যান ঘুরছে, বাতি জ্বলছে আবার এসি থেকে ঠান্ডা বাতাস আসছে। দরজার পাশে হাত মুখ ধোয়ার জন্য বেসিনও আছে। এইসব দেখে রিয়া জিজ্ঞেস করলো,

-বাবা ট্রেনে কারেন্ট কোত্থেকে আসে।

-ডিজেল চালিত শক্তিশালী জেনারেটর আছে সেখান থেকে কারেন্ট উৎপন্ন হয়ে আসে।

– হাত মুখ ধোয়ার জন্য পানি আসে কোত্থেকে।

-ট্রেনের উপরে পানি রাখার জন্য ট্যাংকির ব্যবস্থাআছে সেখানে পাইপ দিয়ে পানি ভরে রাখা হয়।

ট্রেন আস্তে আস্তে চলতে শুরু করলো।  ট্রেনের গতি যখন বাড়তে লাগলো রিয়া জানালা দিয়ে দেখে দূরের গাছপালা, ঘর-বাড়ি সবকিছু যেনো ঘুরছে।

– বাবা দূরের সবকিছু ঘুরছে কেনো?

– ট্রেনটি দ্রুত গতিতে সবকিছু পেছনে ফেলে যাচ্ছে বলে এই রকম মনে হচ্ছে।

-ট্রেন কি ইচ্ছে করলেই থামানো যাবে বাবা?

– ইচ্ছে করে থামানো যাবেনা তবে খুব জরুরী মুহুর্তে যেমন ধরো একজন খুব অসুস্থ হয়ে গেছে তাকে হাসপাতাল না নিলে মারাই যাবে তখন ঐ শেকল ধরে টান দিলে ট্টেন থেমে যাবে। তবে ট্রেন কর্তৃপক্ষের কাছে ট্টেন থামানোর সঠিক কারণ নাদেখাতে পারলে আর্থিক জরিমানা অথবা দন্ড হতে পারে।

ট্রেন চলতে চলতে হঠাৎ থেমে গেলে রিয়া তার বাবাকে জিজ্ঞেস করলো,

-বাবা ট্টেন থেমে গেলো কেনো?

-হয়তো সিগন্যাল পড়েছে।

-সিগন্যাল কি?

-সিগন্যাল হলো ট্রেন চলা এবং থামার সংকেত বিশেষ ট্রেন চলা এবং থামার জন্য তিন ধরনের সিগন্যাল ব্যবহার করা হয়। সিগন্যাল গুলো হলো লাল, সবুজ এবং হলুদ।

লাল বাতির সিগন্যাল মানে ট্রেন থেমে যাবে। লালসিগন্যাল অমান্য করে যদি ট্রেন চলে তবে যেকোন ধরনের ভয়াবহ দূর্ঘটনা ঘটতে পারে।নীলবাতির সিগন্যাল মানে ট্রেন চলতে শুরু করবে। নীলবাতির সিগন্যাল দিলেই মনে করবে লাইন ক্লীয়ার দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা নেই। হলুদবাতির সিগন্যাল মানে ট্রেন অপেক্ষায় থাকবে। 

একটু পরে দুইজন লোক চা আর নাস্তা নিয়ে আসলে রিয়া জিজ্ঞেস করলো,

-এরা চা নাস্তা কোত্থেকে এনেছে বাবা?

– চা নাস্তা খাওয়ার জন্য আলাদা একটি কামরা আছে সেখান থেকে তারা চা-নাস্তা নিয়ে আসে।

ইচ্ছে করলে আমরাও সেখানে গিয়ে চা নাস্তা খেয়ে আসতে পারবো। 

তাছাড়া নামাজ পড়ার জন্যও আলাদা কামরা আছে।

-ট্রেনের মধ্যে দেখছি সবকিছুর ব্যবস্থা আছে। ট্রেনে চড়ে অনেক আরাম এবং  নিরাপদ বোধ করছি। এখন থেকে আমরা ট্রেনে করেই দাদুবাড়ি যাবো এবং আসবো।

-আচ্ছা মামণি।

এমন সময় বই বিক্রেতা বই নিয়ে এলে রিয়া দুটোগল্পের বই কিনে পড়তে থাকে।

দুপুর একটার দিকে ট্রেনটি বিমানবন্দর স্টেশনে এসে থামলো। রিয়ার বাবা বললো,

-এখানেই আমাদের ট্রেনযাত্রা শেষ ।এখনই আমাদের নামতে হবে।

সবাই সর্তক হয়ে ট্রেন থেকে নেমে প্লাটফর্ম অতিক্রম করে বাইরে আসে।

স্টেশনের বাইরে রিয়ার ছোটচাচ্চু তাদের রিসিভ করার জন্য অনেকক্ষণ আগেই গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছিল। রিয়া তার ছোট চাচ্চুকে দেখে দৌড়ে কাছে আসে।

রিয়া তার চাচ্চুকে জড়িয়ে ধরে বললো, জানো চাচ্চু আজকে আমরা ট্রেনে এসেছি! ট্রেনে এসেছি বলে একবারও বমি করিনাই। ট্রেনে ভ্রমণ করা অনেক মজার এবং আরামদায়ক। বিশ্বাস না হয় তুমি একদিন ট্রেন ভ্রমণ করে দেখো।

রিয়ার কথা শুনে সবাই হাসতে হাসতে গাড়ীতে উঠে বাড়ীর উদ্দেশ্যে রওনা দিলো।

শ্রীপুর, গাজীপুর।

দয়াকরে লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০১৮-২০১৯ নবরঙ
Design BY NewsTheme