লেখা আহবান
প্রিয় লেখক বন্ধু, আপনার লেখা সবচেয়ে সুন্দর উপন্যাস, সায়েন্স ফিকশন, ভ্রমণকাহিনী, ফিচার, স্বাস্থ্য কথা ইত্যাদি পাঠিয়ে দিন এই মেইলে– noborongpotrika@gmail.com
অন্ধকার প্রকোষ্ঠ

অন্ধকার প্রকোষ্ঠ

উম্মে হাবিবা আল মুস্তারি

ঈদের দিন। আকাশ থেকে টিপটিপ বৃষ্টি ঝরছে। মরিয়ম খাতুন কবাটে একটি মোড়াতে বসে বিষণ্ন মনে বাহিরে তাকিয়ে আছে। উঠোনে পোষা গাভিটি শুয়ে অনিমেষ চোখে কী যেনো দেখছে। বাড়ির পাশের কাঁচা রাস্তায় শিশুরা ঈদের আনন্দে ছোটাছুটি করছে। তাদের মুখ থেকে ভেসে আসছে বিভিন্ন রকমের বাঁশির সুর। শিশুদের জটলা থেকে রিফাত দৌড়ে এসে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরলো।

মরিয়ম ছেলেকে চুমু দিয়ে শুধালো, তোর বড়োভাই আর রাতুল কোথায়?
–তারা ঈদগাহ ময়দানে গরু জবেহ করা দেখছে।মা! আমি বাঁশি কিনবো, আমাকে টাকা দাও। কান্নামাখা কন্ঠে রিফাত বললো। মরিয়ম খাতুন তার হাতে একটি দশটাকার নোট গুঁজে দিলো। রিফাত টাকা পেয়ে দৌড়ে একটু গিয়ে কী মনে করে আবার ফিরে এসে মায়ের পাশ ঘেঁষে বসে পড়লো!

দেখোনা মা! সবাই বাড়িতে গোস্ত নিয়ে যাচ্ছে আমরা কেন আনছি না?
ছেলের কথায় মায়ের কলিজাটা ধড়ফড় করে উঠলো।মচোখে নামলো আঁসুর পর্দা। চোখ বন্ধ করে ছেলেকে বুকে টেনে নিলো।
–মা, আমরাও গোস্ত আনতে যাই?
–নারে বাপ! আমরা তো কুরবানি করিনি। গোস্ত দেবে কে?
–মা, কুরবানি কেন করে? যারা গরু জবাই করতে পারে তারা গোস্ত খাওয়ার জন্য?
–হুজুরদেরকে ওয়াজে বলতে শুনেছি, সামর্থ্য থাকলে কুরবানি ওয়াজিব। কুরবানি করে আল্লাহকে রাজি করার জন্য। কিন্তু বর্তমানে কে কতো মূল্যের গরু কিনে কুরবানি করতে পারে, সেটা নিয়ে অহংকার করে। পশু কুরবানির সাথে পশুত্বকে কোরবান করতে হবে। নিজের পশুত্ব, নিজের ক্ষুদ্রতা, নিচুতা,স্বার্থপরতা, দীনতা, আমিত্ব, বংশীয় কৌলিন্য আভিজাত্য ত্যাগের কুরাবানীই হচ্ছে ঈদের শিক্ষা। কুরবানির গোস্ত তারাও খেতে পারবে। আর সেখানের একটি অংশ নাকি আমাদের মতো গরীবদেরও।
—মা, তারা আমাদের ঘরে গোস্ত দেবে?
—জানিনা!
—এত্ত গোস্ত কীভাবে খাবে তারা?
—ফ্রিজে রেখে দেবে। ফ্রিজ বের হওয়ার পর থেকে তারা এখন গরীবদেরকে তেমন দেয়না। প্রয়োজনে সারা বছর বের করে খায়।
আমাদের একটা ফ্রিজ থাকলে আমরাও রাখতে পারতাম, না মা?
ও! আমাদের তো গোস্ত নেই, কী রাখবো! নিজেই নিজেই বলে উঠলো রিফাত।
–মা, আমাদের গরুটি জবেহ করোনি কেন?
–ওটা জবাই করলে দুধ বিক্রি করা টাকা কোথায় পাবো?
আচ্ছা মা! মেজোভাই আর আব্বা থাকলে আমরাও গোস্ত আনতে পারতাম না!?
ছেলের কথা মায়ের বুকে ঘ্যাঁচ করে কাঁটা বিঁধলো। কেঁপে উঠলো ওষ্ঠধর। চোখ ফেটে গড়িয়ে পড়ছে বিন্দু বিন্দু অশ্রু।

সত্যি তাই তো! রিফাতের আব্বা কুরবানির ঈদে কাজ করে গোস্ত আনতো অনেক। কয়েকদিন পর্যন্ত খেতে পারতো। কিন্তু আজ…!

রিফাত মায়ের দিকে না তাকিয়ে সাথীদের ডাক পেয়ে এক দৌড়ে তাদের সাথে মিশে গেলো।

মরিয়ম খাতুনের দৃষ্টি সীমানায় দুঃসহ স্মৃতির ঝাপটানি। তার জীবনাকাশে কভু কি বাসন্তী দোলা বয়েছিলো! নাকি কষ্টের নীল দরিয়ার তরঙ্গের সাথে দোল খেতে খেতে এতটুকু পথ পাড়ি দিয়েছে!? সে হারিয়ে গেলো অতীতে।

পাঁচ বোনের মধ্যে দু’নাম্বারে ছিলো মরিয়ম। পিতা চাষাবাদ করে কোনরকম সংসার চালাতো। অভাব -অনটের মধ্যে বড়োবোনের বিয়ে হলো।
মরিয়মের অতোবেশি রূপের ঝলক ছিলো না।
আবার বিশ্রি ছিলো তেমনও না। গরিবের ঘরে জম্নেছে বলে তার রূপের বিকাশ ঘটেনি হয়তো। তার বিয়ের প্রস্তাব আসে। কিন্তু পাত্র ছিলো বোবা! পিতার অর্থনৈতিক অবস্থা এবং ছোট তিনবোনও বিয়ের উপযুক্ত হয়েছে দেখে মরিয়ম সে বিয়েতে রাজি হয়ে যায়। ১৫ বছর বয়সে অনাড়ম্বরভাবে মরিয়মকে শ্বশুড়বাড়ি উঠিয়ে নেয়। স্বামীর পাকা ঘর-বাড়ি দেখে মরিয়ম খুশিতে আত্মহারা। কিন্তু সে ধীরে ধীরে টের পেলো, তার স্বামী তাদের ঘরে প্রজা হিসেবেই থাকছে। তার বাবা -মা নাই। অব্যক্ত জ্বালায় ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে উঠলো তার। এই পরিপূর্ণ যৌবনা মেয়ের মনে কতো কথা আনচান করতো!
ইচ্ছে করতো স্বামীর সাথে প্রেমের আলাপন জুড়ে দিতে। অভিমানে ভালাবসাকে চাঙা করতে। কখনো কাজের ফাঁকে বুনতো সুখকর স্বপ্নের জাল ! কিন্তু যখনই বোবা স্বামীর সকাশে আসতো!তখনই সব কর্পুরের মতো উবে যেতো।

বিয়ের পরে স্বামীর ইশারায় বলা কথা বুঝতে খুব কষ্ট হতো। ঘৃণা লাগতো। নিজের ভাগ্যকে দোষারোপ করতো। কিন্তু কখন যে এই ঘৃণিত বোবা মানুষটিকে মরিয়ম প্রেমের বাহুডোরে আবদ্ধ করে ফেলছে জানে না। কষ্ট হলেও তার কথা প্রায় বুঝতো। দেখতে দেখতে মরিয়ম তিন সন্তানের জননী হলো! সন্তানদের ভবিষ্যত চিন্তা করে সে কিছু টাকা জমা করে বাপের বাড়ির পাশে ছোট্ট একটি জায়গা কিনলো। সেখানে তেরপাল দিয়ে তৈরি করলো নিজেদের বাসস্থান। অবশ্যই মরিয়ম বুঝতে পারতো, তার স্বামী বোবা হলেও খুব ভালোবাসে তাকে। সবসময় তাকে সাজগোজে দেখাটাই যেনো তার স্বামীর চাওয়া। সে এবং সন্তানরা ছেঁড়া কাপড় পরলেও মরিয়মের জন্য নতুন শাড়ি, মাথার ফুল, কানের দুল, চুড়ি নিয়ে আসতো। মরিয়ম এসব পরে লাজরাঙা মুখে স্বামীর কাছে যেতো! বোবা স্বামীটি মৃদু হেসে অপলক চেয়ে থাকতো। কখনোবা কাছে টেনে নিতো।
মরিয়মের জীবনে সুখ বলতে ছিলো এতটুকুই… জীবনের সব চাওয়া-পাওয়া যেনো সেই মুহূর্তটাতেই সীমাবদ্ধ। তার স্বামী মানুষের কাজ-কর্ম করে যা পেতো, তা নিয়ে তাদের সংসার চলে যেতো। পেটভরে তিনবেলা ভাত -তরকারি খেতে পারতো। কিন্তু রোগে-শোকে পেতো না চিকিৎসা। আবার একরোখা বোবা মানুষটিকে কিছু বুঝাতেও পারতো না সহজে। না পারতো আনন্দের কথা প্রকাশ করতে! না পারতো দুখের কথা বলতে। তার হৃদকুটিরের অব্যক্ত শব্দের বিক্ষুব্ধ তরঙ্গমালা দীর্ঘনিশ্বাসের লাভায় বেরিয়ে আসতো। অশ্রু হয়ে ঝরতো। কখনো সন্তানের দিকে তাকিয়ে এক উজ্জ্বল ভবিষ্যত কল্পনা করতো। কিন্তু সেই স্বপ্নও বেশিদিন স্থায়ী হলো না।
বড়ো দু’ছেলে প্লীহা রোগে আক্রান্ত! প্রতিমাসে তাদের রক্ত দিতে হয়। হাসপাতালের ডোনাররা ফ্রিতে রক্ত দিলেও কখনো গাড়ি ভাড়ার অভাবে হাসপাতালও যেতে পারে না। বড়ো ছেলের ১৩ এবং মেজোটার ১১ বছর বয়স হলেও তাদের দেখতে ৮ বছর বয়সের শিশু মনে হতো।
পেট ছাড়া শরীরের বাকি অংশ যেনো হাড্ডিতে চামড়া মোড়ানো। প্রতিবেশিরাও তাদের পাশে ঘেঁষে না! তাদেরকে কোন আয়োজনে ডাকে না। সবাই ঘৃণার নজরে তাদেরকে দেখে।

তৃতীয় ছেলে রিফাতের বয়স তখন পাঁচ।
ততোদিনে মরিয়ম খাতুন স্বামীর কামানো টাকা থেকে ছোট্ট একটি গরুর বাচ্চা কিনে।
স্বামী, অসুস্থ ছেলে আর নিজে মিলে তেরপাল মোড়ানে ঝুপড়িটাকে মাটির দেয়াল করলো। তার স্বামীর হাঁপানি রোগ ছিলো। টাকার অভাবে কোন চিকিৎসা করতে পারেনি। তিন বছর আগে শীতের প্রকোপে তার রোগ প্রচণ্ড আকার ধারণ করলো। বিছানা থেকে উঠতে পারলো না আর।
এদিকে খেয়ে না খেয়ে যে কিছু টাকা জমা করছিলো তাও শেষ হয়ে গেলো। কয়েকমাস তীব্র কষ্টে বিছানায় তড়পাতে তড়পাতে এক অমাবস্যার রাতে তার প্রাণপ্রিয় বোবা স্বামীটি চিরতরে বিদায় হয়ে গেলো।

তখন মরিয়মের চতুর্থ ছেলে রাতুলের বয়স তিন মাস। এবার মরিয়মকে শক্ত করে ধরতে হলো সংসারের হাল। মানুষের ঘরে ঘরে কাজ করা শুরু করলো। মেজো ছেলে রাসেল রোগা হলেও স্টেশনে গিয়ে টাকা/তরকারি নিয়ে আসতো।
গরুটি চরাতো। মা মানুষের ঘরে কাজ করতে গেলে সে ঘরের ডেকসি-পাতিল ধুয়ে রান্না করে ছোট দু’ভাইকে খাওয়াতো। এইতো সেদিন রাসেল তার টাকা দিয়ে মায়ের জন্য একটি ম্যাক্সির কাপড়ও কিনে আনলো। একদিন সে হাসপাতালে রক্ত দিতে গিয়ে সিট থেকে পড়ে গিয়ে হাত-পা ভেঙ্গে যায়। মরিয়ম ভাঙ্গা ছেলেটিকে ঘরে রেখে মানুষের বাড়িতে কাজ করতে যেতে পারে না।
কোলে করে পেশাব পায়খানা করাতে হতো তাকে।
এভাবে কয়েকমাস পর একদিন ভোরে তার নিঃশ্বাসও বন্ধ হয়ে গেলো।

মরিয়ম মানুষের বাড়িতে কাজ না করলে খেতে পারে না এখন। বিত্তশালীদের হাত মরিয়ম পর্যন্ত আসে না। তারা চায় আরো টাকার মালিক হতে। ভোগ-বিলাস আরো বাড়িয়ে দিতে। সারাদিন কাজ করলেও বাড়ির কর্তারা টাকা দেয়ার সময় কত্তো কথা বলে। কখনোবা দেয় না! মানবতা যেনো মুখে চাদর দিয়ে কাঁদছে অঝোর নয়নে।
নৈরাশ্য আর হতাশার মাঝে আকন্ঠ ডুবে যাওয়ার পরেও সন্তানদের মুখের দিকে চেয়ে মানুষের বাড়িতে কাজ করতে হয় তাকে। গরুর দুধ বেচে হাতখরচের কিছু টাকা পায় সে।
কখনো ভাবে, ছোট দু’ছেলে বড় হলে তার অভাব ঘুচবে। বড়ো ছেলেটি বাঁচা মরা সমান। কিন্তু ছোট ছেলে রাতুল ৩ বছর হলে তারও দেখা দেয় প্লীহা রোগ! এরপর থেকে পৃথিবীকে একটি অন্ধকার প্রকোষ্ঠ ছাড়া কিছুই ভাবতে পারে না সে।

কখনো মোনাজাতে আল্লাহর কাছে নালিশ করে ওগো রাব্বুল আলামীন, কোন পাপের কারণে আমার জীবনে এতো দুখের বন্যা। সুখ নামক পায়রাটি আমার হাত স্পর্শ করে না কেন…!

রাত হলে তার ছটফটানি বেড়ে যায়। এই বুঝি আজরাঈল এসে অসুস্থ দু’ছেলের প্রাণও কেড়ে নিচ্ছে! ভয়ে এতটুকুন হয়ে যায় সে। হৃদয়ের স্পন্দন বেড়ে গিয়ে দম বন্ধের উপক্রম হয়ে যায়।
হৃদয়ের অগ্নিদহন সহ্য করতে না পেরে শোয়া থেকে উঠে কয়েক ঢোক পানি খেয়ে ঘুমন্ত সন্তানের দিকে চেয়ে থাকে। রিফাতের দিকে দৃষ্টি গেলে আশার ক্ষীণ প্রদীপের আলোয় নতুন মঞ্জিলের কল্পনা করে। আবার ভাবনারা জড়ো হয়ে সে মঞ্জিলও চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়। দু’চোখে নামে অশ্রুর ঢল..!

আচমকা রাতুলের উল্লসিত চিৎকার শুনে মরিয়মের ভাবনায় ছেদ পড়লো। শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখের পানি মুছে তড়িঘড়ি দাঁড়িয়ে গেলো।
একটু দূরে দেখা গেলো তার ষাটোর্ধ বৃদ্ধ পিতা গনি মিয়া। সে নাতিদের নিয়ে গল্প করতে করতে বাড়ির দিকে আসছে। রাতুলের হাতে ছোট্ট একটি পলিথিন। সে দৌড়ে এসে মায়ের হাতে পলিথিনটি দিয়ে বড়ো গলায় বললো, দেখো মা দেখো! গোস্ত নিয়ে আসছি। রান্না করো জলদি! আমাকে সবচেয়ে বেশি দিতে হবে।
রিফাত তাকে ধমক দিয়ে বলে, না! না! আমাকেই বেশি দিতে হবে। আমি তোর বড়।
–হ্যাঁ, “সবাই খেতে পারবি। তোদের জন্যই তো আনলাম” বলে গনি মিয়া তাদেরকে শান্ত করলো।

মরিয়ম পলিথিন খুলে দেখে, তাতে আধা কেজির মতো গোস্ত। তার বৃদ্ধ পিতাই সেগুলো নিয়ে আসছে। গরিব বৃদ্ধ পিতা মাঝেমধ্যে এভাবে কিছু দিয়ে যায়। ছেলেদের খুশি দেখে মরিয়মের অশান্ত মনটা নিমেষেই শান্তিতে ভরে গেলো।

কেউ কি আছে এভাবে তাদের মুখে একটুকরো হাসি ফোটাবার মতো! মরিয়ম কি পারবে তার আমৃত্যু মানুষের বাড়িতে কাজ করে সংসার চালাতে! তার যৌবনশক্তি কতো দিনইবা ধরে রাখতে পারবে! নাকি তার হাতেও নিতে হবে ভিক্ষার থলে! এই ত্রিশোর্ধ রমনীর জীবনে কতো ঝড় বয়ে গেলো। আরো কতো ঝড় অপেক্ষা করছে কে জানে! এর শেষ কোথায়? মৃত্যু!? এসব ভাবনা তাকে স্থির থাকতো দেয় না।

উখিয়া, কক্সবাজার ০১৮১৩২৭৯৩৮১

দয়াকরে লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০১৮-২০১৯ নবরঙ
Design BY NewsTheme