লেখা আহবান
প্রিয় লেখক বন্ধু, আপনার লেখা সবচেয়ে সুন্দর উপন্যাস, সায়েন্স ফিকশন, ভ্রমণকাহিনী, ফিচার, স্বাস্থ্য কথা ইত্যাদি পাঠিয়ে দিন এই মেইলে– noborongpotrika@gmail.com
ঈদুল আযহার নির্দেশিকা

ঈদুল আযহার নির্দেশিকা

প্রফেসর-মোহাম্মদ শেখ শরীফ


ঈদুল আজহা- মুসলামদের অন্যতম একটি ঈদ আনন্দ উৎসব। ঈদ মানে আনন্দ ঈদ মানে খুশী।বিখ্যাত আরবী অভিধান গ্রন্থে ‘আল মাওরিদ’ এ ঈদ শব্দের অর্থ বলা হয়েছে ভোজন, ধর্মোৎসব, পর্ব, তীব্র আনন্দ, ভূরিভোজন করা, ভোজ দেওয়া, ভূরিভোজন করানো, পরিতৃপ্ত, আহার করা, আমেজ করা, ইত্যাদি। ঈদ হচ্ছে আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত আনন্দ করার এক মহাউৎসব।

আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার জন্য দাওয়াত-বিধায় ঐদিন হলো ভূরিভোজনের সুযোগ, বেশী বেশী করে খাওয়ার দিন, রোযা না রাখার দিন। আর মুসলমানদের জীবনে ঈদ বছরে দুইটি। এক ঈদুল ফিতর আর অপরটি ঈদুল আজহা। সকলের ঈদ হোক আনন্দময় এবং ত্যাগের মহিমায় এ প্রত্যাশায় ঈদুল আযহার দিনে করণীয় আর বর্জনীয় বিষয়ে সংক্ষিপ্ত নির্দেশিকা।

আরাফাতের রোযাঃ 
আপনার ঈদ উৎসব শুরু হোক আরাফাতের রোযা রাখার মাধ্যমে। আল্লাহর রাসূল সা. বলেছেন “আরাফার দিবসের রোযা সামনের এবং পিছনের দুই বছরে গুনাহ ঢেকে ফেলে” (মুসলিম)। তবে যারা হজ্জ করতে আরাফাত ময়দানে অবস্থান করবেন, তাদের জন্য আরাফার দিবসে কোন রোযা নেই।

তাকবির বলাঃ
১০ই যিলহাজ্জ ঈদের দিন। আপনি ঈদের দিবসকে স্বাগতম জানান, তাকবীরের মাধ্যমে। কেননা রাসূল সা. বলেছেন- “তোমারা তোমাদের ঈদগুলোকে তাকবীর বলার মাধ্যমে সুন্দর, আনন্দময় এবং জাঁকজমকপূর্ণ করে তোল”। 

ঈদের গোসলঃ 
“আত্তুহুরু শুবাতুম মিনাল ঈমান” পবিত্রতা ঈমানের অংঙ্গ। তাই পবিত্রতা অর্জনের মাধ্যমে শুরু হবে মুসলমানের ঈদ। ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বে আপনি ভালভাবে গোসল করে নিন। আর এই গোসল সুন্নাত গোসলগুলোর মধ্যে অন্যতম।

মেসওয়াক করাঃ 
মুখমন্ডলের পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতার জন্য প্রতিদিনের মতো আপনি মেসওয়াক করে নিন। মনে রাখতে হবে মেসওয়াক করা রাসূল সা. এর দৈনন্দিন সুন্নাত সমূহের একটি অন্যতম সুন্নাত। মেসওয়াকের মাধ্যমে আপনার মুখের অভ্যান্তরিন সুন্দর্য গড়ে তুলতে পারেন।

উত্তম পোষাক পরিধানঃ
ঈদের দিন রাসূল সা. ভাল পোষাক পরতেন। হাদীসে আছে-রাসূল সা. এর লাল ও সবুজ এর মত একটি চাদর ছিল, তিনি তা দুই ঈদ এবং জুমার দিন পরিধান করতেন। সামর্থ অনুযায়ী নতুন পোষাক ক্রয় করুন অথবা পুরাতন পোষাককে পরিষ্কার করে তা পরিধানের যোগ্য করে তুলতে পারেন। পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের পোষাকের ব্যবস্থা করতে হবে, নতুন কাপড় ক্রয় করতে না পারলেও পুরাতন কাপড়কে পরিধানের জন্য প্রস্তুত করে তুলতে হবে। প্রতিবেশীর শিশুদের জন্য সামর্থ্য অনুযায়ী পোষাকের ব্যবস্থা নিন। কারণ প্রতিবেশির হক আদায় করা জরুরী। 

সুগন্ধি ব্যবহারঃ 
সুগন্ধি ব্যবহার সুন্নাত। আর ঈদের দিনে রাসূল সা. বিশেষভাবে সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। রাসূল সা. এর তিনটি পছন্দনীয় জিনিসের মাঝে একটি হলো সুগন্ধি। তাই ঈদের দিনের পোষাক পরিধানের পর সুগন্ধি ব্যবহার করতে হবে। দেহনাল উদ বা আতর ব্যবহার করুন। কোন প্রকার বডি স্প্রে হতে বিরত থাকুন।

ঈদের দিনের খাওয়া দাওয়াঃ
ঈদুল আযহার দিনে সুবহে সাদিকের পর কিছু খাবেন না। না খেয়ে ঈদগাহে চলে যান। ঈদের নামায আদায় শেষে প্রথমে কুরবানী দিন। এর পর কিছু খান। মনে রাখবেন, ঈদুল ফিতরের দিনে ঈদগাহে যাবার কালে খেজুর খাওয়া সুন্নাত। কিন্তু ঈদুল আজহার দিন তার বিপরীত। ঈদুল আজহার দিনে সুবহে সাদিক থেকে কুরবানী করা পর্যন্ত কিছু না খাওয়া সুন্নাত। 

ঈদগাহে যাওয়া আসার রাস্তা নির্বাচনঃ
আল্লাহর রাসূল সা. এক পথে ঈদগাহে যেতেন, অন্য পথে আসতেন, বিধায় আপনিও যাবেন একই নীতি অনুসরণ রাখতে। আপনার ঈদগাহে যাওয়ার এবং আসার পথ পূর্বেই নির্বাচন করে নিন। এতে করে আপনার বেশী সংখ্যক লোকের সাথে সাক্ষাত করার সুযোগ হবে। যাওয়া আসার পথে লোকদের সাথে সালাম, মুসাফাহা, মুয়ানাকা, মুছাদারাহ করুন। শুভেচ্ছা বিনিময় করুন। দোয়া করুন, একে অপরের কল্যাণ কামনা করুন।

শুভেচ্ছা বিনিময়ঃ 
ঈদের দিনে ছোট-বড় সকলের সাথে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করুন। ঈদের দিনে সাহাবায়ে কিরামদের সম্ভাষণ ছিল-(আল্লাহুম্মা তাক্বাব্বাল মিন্না ওয়া মিনকা)। বিধায় আপনিও সাহাবায়ে কিরামদের সম্ভাষণ ব্যবহারে অভ্যস্ত হোন। ঈদ মুবারক বলুন, পারস্পরিক দোয়া বিনিময় করুন।

পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যাওয়াঃ
রাসূল সা. ঈদগাহে পায়ে হেটে যেতেন, এবং পায়ে হেটে ফেরত আসতেন। আপনিও আপনার নেতা মুহাম্মদ সা. এর অনুসরণ করুন। মটর সাইকেল বা গাড়ীতে করে ঈদগাহে যাবেন না, এতে করে ঈদগাহে দেরীকে করে যাওয়া হয়, তাড়াতাড়ি ফিরা হয়।

স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে ঈদগাহে যাওয়াঃ
ঈদের দিনে আল্লাহর রাসূল সা. স্ত্রী কন্যাদের নিয়ে ঈদগাহে যেতেন। বিধায় আপনিও আপনার স্ত্রী এবং সন্তানদের নিয়ে ঈদগাহে যান। মহিলারা যাতে পর্দার সাথে যায়, সে দিকে লক্ষ্য রাখুন। যে সব মহিলার মাসিক অসুখ রয়েছে, তারাও ঈদগাতে যেতে পারবে, তবে নামায পড়তে পারবেনা, শুধু খুতবা শুনবে। যে স্থানে মহিলাদের জন্য নামাযের ব্যবস্থা রয়েছে, সেখানেই মহিলাদের সঙ্গে নিয়ে যেতে পারবেন।

ঈদগাহে ভিআইপি প্রটোকলঃ ভিআইপি প্রটোকল নিয়ে ঈদগাহে যাবেন না, কাউকে ঈদগাহে ভিআইপি প্রটোকল দেবেন না। যিনি ঈদগাহে প্রথমে হাজির হবেন, তাকে প্রথম কাতারে বা ইমামের পিছনে নামাযের সুযোগ দিন। বিশিষ্ট ব্যক্তি যদি পরে আসেন, তাহলে যেখানে জায়গা পান, সেখানে দাড়িয়ে যান। আজ ঈদের দিন, আমীর ফকীর সবাই সমান।

ঈদের নামায আদায়ঃ 
ঈদের নামায শুরু হয় ১ম হিজরীতে নবী সা. ঈদের নামায নিয়মিত আদায় করেছেন এবং মুসলামানদের ঈদের জামায়াতে হাজিরের নির্দেশ দিয়েছেন। ঈদের নামাযের পূর্বে এবং ফজরের নামযের পরে কোন নামায নেই। ঈদের নামাযের কোন আযান এবং একামাতও নেই। ঈদের নামাযে সুরা আলা ও গাশিয়াহ বা সূরা ক্বাফ ও কামার পড়া সুন্নাত। 

ঈদের নামাযঃ 
বৃষ্টি ছাড়া অন্য কোন কারণে ঈদের নামায মসজিদে পড়ার কোন সুযোগ নাই। রাসূল সা. ঈদের নামায পড়েছেন মসজিদের নব্বীর ৫০০ গজ দূরে “বাত্বহান” নামক স্থানে। তাঁর জীবনে মাত্র একবার বৃষ্টির কারণে মসজিদে নববীতে ঈদের নামায পড়া হয়। 


খুৎবা শুনাঃ 
ঈদের নামাযের পর খুতবা প্রদান করতে হয়। এই খুতবা শুনা অত্যন্ত জরুরী। অত্যন্ত মনযোগের সাথে এই খুতবা শ্রবণ করুন। খুতবাতে দেশ, জাতি এবং বিশ্বের সমসাময়িক অবস্থা ও পরিস্থতি, সারা বিশ্বের মুসলমানদের অবস্থা এবং বিশ্বপরিস্থিতিতে মুসলমানদের করনীয় আলোচিত হওয়া দরকার।

কুরবানী আদায়ঃ 
কুরবানীর জন্য ক্রয় করা পশু কুরবানী করতে হবে ঈদের নামায থেকে ফিরে। নিজের কুরবানী নিজেই যবেহ করা উত্তম। কুরবানীর পশু জবাই করার সময় হযরত ইব্রাহীম আ. এর পরীক্ষার কথা স্মরণ করা, ত্যাগের চেতনায় নিজেকে উজ্জিবিত করা আর জীবন সংগ্রামের প্রতিটি বাঁকে বাঁকে আল্লাহর নির্দেশের সামনে নিজের সর্বস্ব ত্যাগ বা কুরবানী করার শপথ নেয়া। নিজের বলতে যা আছে, সব আল্লাহর জন্য নিবেদিত করার ঘোষনা দেয়া। বিশেষ করে হায়াতে জিন্দেগীর মূল্যবান সময়টা আল্লাহর পথে ব্যয় করার ঘোষনা প্রদান-
“নিশ্চয়ই আমার নামায, আমার কুরবানী, আমার জীবন এবং আমার মৃত্যু, সবই আল্লাহ জন্য যিনি বিশ্ব জাহানের রব”।

কুরবানীর গোশত বিতরণঃ 
কুরবানীর গোশত দেরী না করে তাড়াতাড়ি বিতরণ করা দরকার। বিশেষ করে গরীবদেরকে তাড়াতাড়ি দিয়ে দেওয়া উচিত। সম্ভব হলে গোশত পাক করার জন্য মশলা কেনার সামান্য পয়সাও হাদিয়া দেওয়া। কুরবানীর গোশত কাটাকাটির কাজে যারা সহযোগিতা করবে, তাদেরকে অর্থ পারিশ্রমিক দিতে হবে। কুরবানীর গোশত পারিশ্রমিক হিসাবে না দেয়া। কুরবানীর গোশত ফ্রিজে ভরে না রাখা। গরীর-দুঃখী, আত্মীয়-স্বজনদের দাওয়াত করে খাওয়ানো।

ঈদের দিনে রোযাঃ 
ঈদের দিনে রোযা রাখা হারাম। নবী সা. ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিনে রোযা রাখতে নিষেধ করেছে।

ঈদের দিনে জুময়াঃ
জুমার দিন ঈদ হলে ঈদ এবং জুময়া দু’টিই পড়তে হবে। 

ঈদের দিনে কবর যিয়ারতঃ 
ঈদের নামায শেষ করে, যাদের মা-বাবা নেই বা যাদের আত্মীয়বর্গ কবরবাসী হয়েছেন, তাদের কবর জিয়ারত করা। 

গরিব অসহায়দের ধমক না দেয়াঃ
যারা গোশতের জন্য আসবে তাদেরকে কোন প্রকার ধমক না দেয়া। সামর্থ থাকলে দিবেন, না হলে সুন্দর কথা দিয়ে বিদায় করুন, কোন প্রকার জুলুম কুরবেননা, এতে আপনার কুরবানি নাও হতে পারে।

দয়াকরে লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০১৮-২০১৯ নবরঙ
Design BY NewsTheme