লেখা আহবান
প্রিয় লেখক বন্ধু, আপনার লেখা সবচেয়ে সুন্দর উপন্যাস, সায়েন্স ফিকশন, ভ্রমণকাহিনী, ফিচার, স্বাস্থ্য কথা ইত্যাদি পাঠিয়ে দিন এই মেইলে– noborongpotrika@gmail.com
বর্ষাকাল ও বাংলাদেশ

বর্ষাকাল ও বাংলাদেশ

দিপংকর দাশ

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রতীক আমাদের এই বাংলাদেশ। প্রকৃতি যেন আপন রংতুলিতে নিখুঁতভাবে এঁকেছে এই দৃশ্য। কালের পরিক্রমায় বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য জয় করেছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের মন। বিশেষ করে যেখানে বিশ্বের অন্যান্য দেশে দুইটি বা চারটি ঋতু দেখা যায় সেখানে বাংলাদেশে রয়েছে আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন ছয়টি ঋতু। একেকটি ঋতু বাংলাদেশের মানুষের মনে এঁকে যায় একেকটি চিত্রকল্প। 
ছয়টি ঋতুর মধ্যে বর্ষাকাল হলো দ্বিতীয় ঋতু। গ্রীষ্মের অসহ্য গরম আর কালবৈশাখীর তাণ্ডবের পর আসে বর্ষাকাল। মূলত আষাঢ়-শ্রাবণ এ দুই মাস মিলে হয় বর্ষাকাল। কিন্তু কখনো কখনো জ্যৈষ্ঠ মাসের মাঝামাঝিতেই চারিদিকে প্লাবিত হয়ে যায়। বর্ষাকালে বাংলাদেশের নিচু এলাকাগুলো তলিয়ে যায় পানির নিচে। নদীর বুক ফুলে-ফেঁপে ওঠে। ঢেউ খেলে যায় অবিরাম। নদীনালা, খাল-বিল, পুকুর-ঝিল, হাওর-বাওর পানিতে থৈ থৈ করতে থাকে। তাকালে মনে হয় এ যেন জলের রাজ্য। জল ছাড়া কিছুই দেখা যায় না।
গ্রামগুলোকে মনে হয় জলের উপর ভাসমান একেকটি দ্বীপ। মাঠের গাছগুলো গলা পর্যন্ত পানিতে তলিয়ে যায়। সেই গাছে ঝাঁক বেঁধে বসে থাকে হাজারো পাখি। 
সারা দিন-রাত অবিরাম বৃষ্টি পড়তে থাকে। কখনো ইলশেগুঁড়ি আবার কখনো অবিরাম জলধারা। কোনো কাজে যেতে হলে ছাতা নিয়ে যেতে হয়। বর্ষায় বৃষ্টির কারণে ব্যাহত হয় জনজীবন। রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে যায়, কর্দমাক্ত হয় কিংবা পিচ্ছিল হয়ে যায়। হাঁটা চলায় মারাত্মক অসুবিধার সৃষ্টি হয়। কখনো কখনো আছাড় খেয়ে ভেঙ্গে যায় বুড়ো-বুড়ির কোমর। ঘরবাড়ি তলিয়ে যায় পানির নিচে। ঘরবাড়ি হারিয়ে অনেকেই পথে বসে যায়।
হাটে-বাজারে যাওয়া যায় না। স্কুলগুলোতে কমে যায় ছাত্রছাত্রীর উপস্থিতি। সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে নেমে আসে দূর্ভোগ। কাজে যেতে পারে না সাধারণ মানুষ। ঘরে বসে থাকে সারাক্ষণ।
বর্ষাকালে কদম ফুলে ভরে যায় কদম্ব গাছ। কদমের পাপড়ি ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেলায় মেতে উঠে বাচ্চারা। ঘরে বসে লুডু খেলা কিংবা ক্যারাম খেলায় মেতে উঠে শিশু ও যুবক।
গ্রামের ঘরে ঘরে বৃদ্ধরা বসে বসে বাঁশ দিয়ে তৈরী করে মাছ ধরার চাই, কলুই ইত্যাদি। ছোট ছোট জাল তৈরী করে মাছ ধরতে যায় অনেকেই। বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে রুটি রুজির তাগিদে নদীতে জাল ফেলে জেলেরা। সে মাছ গঞ্জে বিক্রী করে তারা।
টিনের চালে বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ মনের ভিতর এক সুখানুভূতি সৃষ্টি করে। গল্পে আড্ডায় মেতে উঠে দাদাদাদী আর নাতী নাতনীর দল। রান্না হয় মজার মজার খাবার। বৃষ্টির দিনে বিশেষ করে খিচুড়ি রান্না হয় বেশি। গরম গরম খিচুড়ি খেতে কার না ভালো লাগে তখন?
বর্ষাকালের প্লাবন বয়ে নিয়ে আসে পলিমাটি। পলিমাটি এক ধরণের কাদা যা ফসলের উপকার করে। জমিতে ফসল উৎপাদনে এ পলিমাটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ।
বর্ষাকালে নদীর বুকে পাল উড়িয়ে চলে ছোট ছোট নৌকা। তখন গ্রামে যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম হয় নৌকা। বড় বড় নৌকা দূর-দূরান্ত থেকে নিয়ে আসে প্রয়োজনীয় মালামাল। এ গ্রাম থেকে ও গ্রামে যেতে প্রধান মাধ্যম হয় নৌকা। তাছাড়া অনেক গ্রামে ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচের আয়োজন করা হয়। পারদর্শী মাঝিরা এসব প্রতিযোগীতায় তাদের বড় বড় নৌকা নিয়ে অংশগ্রহণ করে। খুব আনন্দ লাগে এসব দেখতে।
বর্ষাকালে গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে আসে গাজীর গাইন। তারা বিভিন্ন ধরণের গান গেয়ে আনন্দ দেয় মানুষকে। তাছাড়া এসব গান মানুষের হৃদয় জয় করে নেয় সহজেই। বিভিন্ন জায়গায় বসে বাউল গানের আসর। মন জুড়িয়ে যায় দরদ ভরা সেই গানগুলোর সুর কানে যখন ধ্বনিত হয়।
উপকারিতা ও অপকারিতা এই দুইয়ের সমন্বয়ে বর্ষাকাল বাংলাদেশের বুকে এক অনন্য নজির রেখে যায়। বর্ষাকালের রুপবৈচিত্র‍্য দেখলে জুড়িয়ে যায় প্রাণ। পুলকিত চিত্তে গাইতে ইচ্ছে করে জারি-সারি আর বাউল গান। কবির কবিতার ছন্দে বৃষ্টির টুপ টাপ শব্দ যেন নতুন সুরের সৃষ্টি করে। তাই বর্ষাকাল বাংলাদেশের মানুষের জীবনের সাথে দারুণ ভাবে মিশে আছে অনন্তকাল ধরে।

আজমিরীগঞ্জ, হবিগঞ্জ।

দয়াকরে লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০১৮-২০১৯ নবরঙ
Design BY NewsTheme