লেখা আহবান
প্রিয় লেখক বন্ধু, আপনার লেখা সবচেয়ে সুন্দর উপন্যাস, সায়েন্স ফিকশন, ভ্রমণকাহিনী, ফিচার, স্বাস্থ্য কথা ইত্যাদি পাঠিয়ে দিন এই মেইলে– noborongpotrika@gmail.com

লম্বু জনি

ইকবাল খন্দকার

এক

মনসুর স্যার চমকে উঠলেন।
তিনি বসা থেকে দাঁড়িয়ে গেলেন।
কী হলো?
কেউ কি….
মনসুর স্যার অফিসরুমে বসে কাজ করছিলেন। খাতা দেখার কাজ। তিনি খাতা-কলম গুছিয়ে রেখে দরজায় এসে দাঁড়ান। দেখেন ক্লাস নাইনের রুমের সামনে ছাত্র ছাত্রীদের বড়সড় জটলা। কী হয়েছে জানার জন্যে তিনি এগিয়ে গেলেন জটলার দিকে। স্যারকে দেখেই ছাত্র ছাত্রীরা হইচই থামিয়ে দিল। তড়িঘড়ি করে রুমে ঢুকে যেতে লাগল কেউ কেউ। স্যার গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলেন-কী হয়েছে এখানে? স্যারের প্রশ্ন শুনে কেউ ঠোঁট টিপে হাসতে লাগল, কেউবা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। কারো পক্ষ থেকেই কোন উত্তর এলো না। স্যার একই প্রশ্ন আবার করলেন। এবারও সবাই নিরুত্তর। তবে যারা ঠোঁট টিপে হাসছিল, তাদের হাসি আরো বেড়ে গেল।
-কী ব্যাপার, আমার কথা কারো কানে যাচ্ছে না?
-স্যার…
-কী?
-স্যার, একটা ঘটনা ঘটে গেছে।
-ঘটনাটা কী, আমি তো সেটাই জানতে চাচ্ছি।
-স্যার, আমাদের ক্লাসের একজন ধড়াম করে পড়ে গেছে। অনেক কষ্টে হাসি চেপে বলল রবিন।
-কীভাবে পড়ল?
-দরজার চৌকাঠে বাড়ি খেয়ে স্যার। রবিন এবার আর হাসি চেপে রাখতে পারল না। ফিক করে হেসে ফেলল।
-এই ছেলে, হাসবে না বলছি। চৌকাঠে বাড়ি খেল কীভাবে?
-স্যার, যে বাড়ি খেয়েছে, সে জিরাফের মত লম্বা। যেখানে সেখানে তার মাথা বাড়ি খায়। কদিন পর হয়তো ছাদে গিয়ে বাড়ি খাবে।
রবিনের কথায় সবাই হো হো করে হেসে উঠল। স্যার হাতের ইশারায় সবার হাসি থামিয়ে বললেন-তোমাদের ক্লাসে তো এতো লম্বা কেউ নেই, যার মাথা চৌকাঠে বাড়ি খেতে পারে? রবিন এবার স্যারের কাছে এসে দাঁড়াল-স্যার, আপনি ক দিন ছুটিতে ছিলেন। তাই হয়তো জানেন না। আমাদের ক্লাসে নতুন একজন ছাত্র ভর্তি হয়েছে। হাড়িসাংগান হাইস্কুল থেকে এসেছে। আগে আমাদের মধ্যে সবচেয়ে লম্বা ছিল ইমরান। নতুন ছেলেটা ইমরানের চেয়ে এক হাত লম্বা। বেশিও হতে পারে। সারাদিন সে মাথা নিচু করে রাখে। তবু এখানে ওখানে বাড়ি খায়। সে যখন বেঞ্চে বসে থাকে, মনে হয় দাঁড়িয়ে আছে। তার একটা প্যান্টও মাপ মতো হয় না স্যার। সবগুলো খাটো।
-আমি তোমার কাছে এতোকিছু জানতে চাইনি। কথা একটু কম বলার অভ্যাস করো।
-সরি স্যার।
-ছেলেটা এখন কোথায়?
-ঐ যে স্যার, কোণায় বসে আছে।
রবিন ডান হাতের তর্জুনি ক্লাসরুমের দিকে তাক করে। স্যার দেখতে পান একটা ছেলে হাইবেঞ্চের উপর কপাল রেখে চুপচাপ বসে আছে। কুনুইয়ের উপরের অংশের জন্যে তার মুখ দেখা যাচ্ছে না। তবে তার বসে থাকার ভঙ্গিই বলে দিচ্ছে, উচ্চতায় সে বিরাট। স্যার ছেলেটার কাছে যান। আঙুলের মাথা দিয়ে বেঞ্চে টকটক শব্দ করেন। ছেলেটা মাথা তোলে না। আরিফ ফাজলামো করে বলে-মনে হয় ঘুমিয়ে স্বপ্ন টপ্ন দেখছে। স্যার আরিফের দিকে ফিরে তাকান। স্যারের চোখে রাগ বা বিরক্তি নেই। তবু ভয় পেয়ে যায় আরিফ। সে আস্তে আস্তে সরে যায় পেছন দিকে। আর রবিন ছেলেটার কানের কাছে মুখ নিয়ে বলে-এই মিয়া, ওঠো না কেন! ওঠো ওঠো, স্যার এসেছেন।
এবার বসা থেকে প্রায় লাফিয়ে ওঠে ছেলেটা। উঠেই সালাম দেয় স্যারকে। স্যার সালামের জবাব দিয়ে জিজ্ঞেস করেন-কী নাম তোমার বাবা? ছেলেটা জবাব দেয়-স্যার আমার নাম জনি। জয়নাল আবেদিন জনি। স্যার মমতা মেশানো গলায় বলেন-মাথায় অনেক ব্যথা পেয়েছো, না? জনি নিষ্প্রাণ হাসি দিয়ে বলে-না স্যার, বেশি না। সামান্য একটু লেগেছে। নাঈম জনির কথার প্রতিবাদ করে-কিসের সামান্য লেগেছে! সামান্য লাগলে ধড়াম করে পড়ে গেলে কেন? স্যার, সে দুইবার ব্যথা পেয়েছে। একবার ব্যথা পেয়েছে মাথায়; চৌকাঠের সঙ্গে বাড়ি লেগে। আবার ব্যথা পেয়েছে পিঠে। বাড়ি খেয়েই পেছনে পড়ে গিয়েছিল। স্যার বললেন-মাথার কোন জায়গাটায় লেগেছিল দেখি তো! কেটে টেটে যায়নি তো আবার? দেখি, মাথা নিচু করো।
জনি মাথা নিচু করে। তবু স্যার তার মাথা নাগাল পান না। স্যার বলেন আরো নিচু করার জন্যে। জনি আরো নিচু করে। নিচু করতে করতে কুঁজো মানুষের মতো হয়ে যায়। স্যার তবু দেখতে পান না। এদিকে রবিনরা মুখ চেপে হাসছে। স্যার জনিকে বলেন বেঞ্চে বসার জন্যে। জনি বসে। স্যার এবার তার মাথা অল্প অল্প নাগাল পাচ্ছেন। কিন্তু কোথাও কেটেছে কিনা দেখতে হলে আরো ভালোভাবে নাগাল পাওয়া দরকার। স্যার বললেন-তুমি বেঞ্চ থেকে নেমে আসো। এসে ফ্লোরে বসো। জনি ফ্লোরে বসে। রুমজুড়ে তখন কেবল হাসির শব্দ। ক্লাসের সবাই হাসছে। হাসার মত দৃশ্যই বটে। জনি বসে আছে, তবু উচ্চতায় প্রায় স্যারের সমান। অথচ মনসুর স্যার মানুষটা যে খুব খাটো, তা কিন্তু না।
স্যার জনির মাথায় কাটার কোন চিহ্ন পান না। শুধু এক জায়গায় কালো একটা দাগ দেখতে পান। রক্ত জমাট বেধে থাকার দাগ। স্যার তার পকেট থেকে মলমের একটা কৌটা বের করেন। তারপর নিজ হাতে কালো জায়গাটায় মলম মালিশ করে দেন। জিজ্ঞেস করেন পিঠেও চোট লেগেছে কি না। জনি না বলে। মনসুর স্যার বলে যান। রবিনরা হাসাহাসি করার স্বাধীনতা পায়। গলা ছেড়ে হাসতে থাকে সবাই। কেউ কেউ তো হাসতে হাসতে পারলে লুটিয়ে পড়ে। ক্লাসে যারা চরম দুষ্টু হিসেবে পরিচিত, তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে জিতু। জিতু গিয়ে বসে জনির পাশে। অত্যন্ত ভদ্রতার সঙ্গে বলে-তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করতে চাই। করবো?
-জ্বি, করো। জনি সরল মনে অনুমতি দেয়।
-কামারটা কি তোমাদের পরিচিত?
-মানে?
-এমনভাবে মানে বলছো, যেন কামার চেনো না। ঐযে যারা লোহা দিয়ে নানারকম জিনিসপত্র বানায়, তারাই কামার।
-কামার তো চিনিই।
-কামার চেনো, কিন্তু আমি কামারের কথা কেন বলছি, সেটা বুঝতে পারছো না, তাই তো? আচ্ছা, বুঝিয়ে বলছি। মানুষ লম্বা হওয়ার জন্যে কী করে? রিংয়ে ঝোলে। আমার মামাও রিংয়ে ঝুলেই লম্বা হয়েছে। তবে নরমাল রিংয়ে ঝুলে কিন্তু দুই এক ইঞ্চির বেশি লম্বা হওয়া যায় না। তুমি যে এতো লম্বা হয়েছো, তুমি নিশ্চয়ই নরমাল রিংয়ে ঝোলোনি। ঝুলেছো স্পেশাল কোনো রিংয়ে। আর সেই রিংটা অবশ্যই কামারের কাছ থেকে অর্ডার দিয়ে বানিয়ে নিছোছো। আমি জানতে চাচ্ছি, যে কামারের কাছ থেকে রিংটা তুমি বানিয়েছো, সে তোমার পরিচিত কিনা। মানে তুমি সেই কামার সাহেবের নাম ঠিকানা জানো কিনা। জানলে আমাকে বলো। আমি একটা রিং বানাবো। তোমার মত লম্বা হওয়ার খুব শখ আমার। কারণ আমি চিড়িয়াখানায় গিয়ে জিরাফের সঙ্গে কোলাকুলি করতে চাই। জিরাফের মত লম্বা না হলে কি জিরাফ আমার সঙ্গে কোলাকুলি করতে চাইবে, বলো?
জিতুর কথার উত্তরে কিছুই বলে না জনি। সে মাথা নিচু করে বসে থাকে। ক্লাসে তখন হাসির ঝড় তুফান বইছে। জনির ইচ্ছে করছে ক্লাস থেকে বের হয়ে যেতে। কিন্তু যতই ইচ্ছে করুক, সে যাবে না। এটা ওদের যেমন ক্লাসরুম, তারও ক্লাসরুম। ওরা ক্লাসে থাকবে, আর সে চলে যাবে-এটা হতে পারে না। ঠাট্টা ইয়ার্কি করছে, করুক। আজ করবে, কাল করবে, পরশু করবে। তারপর অবশ্যই টায়ার্ড হবে। এছাড়া তাদেরই বা দোষ কী। সে যেখানে যায়, সেখানেই তো মানুষ তার উচ্চতা নিয়ে হাসাহাসি করে। তার এক ফুফাত ভাই একবার রাতেরবেলা তাকে দেখে ‘ভূত’ বলে চিৎকার দিয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল। জনি মাথা নিচু করে বসে থাকতে থাকতে যখন চোখে সর্ষে ফুল দেখছিল, তখন হঠাৎ পুরো ক্লাস নীরব হয়ে যায়। জনি মাথা তুলে দেখে ম্যাডাম এসেছেন।
।। দুই।।
পরদিন। জনি বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। ক্লাস শুরু হতে বাকি আছে মাত্র ছয় মিনিট। তবু জনি এখন ক্লাসে ঢুকবে না। যখন স্যারকে অফিস থেকে বের হতে আসতে দেখবে, তখন ঢুকবে। কারণ আগে আগে ঢুকলে তাকে একা পেয়ে সবাই খোঁচাবে। জনি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রাস্তা দিয়ে দ্রুত চলে যাওয়া রিকশা, সিএনজি দেখে। দেখতে দেখতে ছয় মিনিটের জায়গায় আট মিনিট পার করে দেয়। কিন্তু স্যার আসেন না। জনি অফিসের দিকে এগোয়। তবে অফিসরুমের সামনে যাওয়ার সাহস তার নেই। শুধু তার কেন, স্কুলের কারোই নেই। হেডস্যার আইন করেছেন-ছাত্র ছাত্রীরা অকারণে অফিসরুমের সামনে যেতে বা ঘোরাঘুরি করতে পারবে না।
-জনি।
-জ্বি। জনি পেছনে তাকায়। দেখে জিতু দাঁড়িয়ে আছে।
-আমার সঙ্গে এক জায়গায় চলো।
-কোথায়?
-দূরে না। চলো।
-কিন্তু এখন তো কোথাও যাওয়া যাবে না। ক্লাস শুরু হবে।
-স্যারদের জরুরী মিটিং আছে। তাই প্রথম ক্লাসটা হবে না।
-আমার মনে হচ্ছে ক্লাস হবে।
-আমার উপর বিশ্বাস রাখো। আমি মিথ্যা কথা বলি ঠিকই, তবে এখন যা বললাম, সেটা মিথ্যা না। চলো আমার সাথে।
-কিন্তু কোথায় যাবো একটু বলবে না?
-গেলেই দেখতে পাবে। চলো তো!
জিতু জনিকে নিয়ে স্কুলের পেছনের পুকুরপাড়ে যায়। পুকুরপাড়ে অনেকগুলো সুপারি গাছ। জিতু একটা সুপারিগাছের নিচে দাঁড়িয়ে বলে-তোমাকে এখানে কেন নিয়ে এসেছি জানো? জানো না। তোমাকে নিয়ে এসেছি আমার একটা কৌতূহল মেটানোর জন্যে। তোমাকে যখন আমি প্রথম দেখলাম, তখন থেকেই আমার মনে একটা কৌতূহল তৈরী হয়েছে। কৌতূহলটা না মিটিয়ে শান্তি পাচ্ছিলাম না। জনি ম্লান মুখে জিজ্ঞেস করে-কী কৌতূহল? জিতু প্যান্টের পকেটে হাত ঢোকাতে ঢোকাতে বলে-আমাদের এই পুকুরপাড়ে মোট কয়টা সুপারিগাছ আছে বলতে পারবে? বড় ছোট মিলিয়ে একশো ছাব্বিশটা সুপারিগাছ আছে। সবচেয়ে লম্বা হচ্ছে ঐ গাছটা।
-ও, আচ্ছা।
-তো তোমাকে দেখার পর আমার মনে একটা প্রশ্নই ঘুরঘুর করছিল-কে বেশি লম্বা। তুমি নাকি সুপারিগাছটা। তুমি এখন সুপারিগাছটার পাশে দাঁড়াবে। আমি দেখবো তুমি গাছটার চেয়ে কতটুকু বেশি লম্বা।
ঠা-ঠা করে হাসতে থাকে জিতু। জনি বোকা হয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। তার বুঝতে বাকি থাকে না, তামাশা করার জন্যেই জিতু তাকে এখানে নিয়ে এসেছে। জিতু হাসতে হাসতে ক্লান্ত হয়ে জনির ডানহাত ধরে বলে-থাক, এখন আর মাপামাপি করতে হবে না। মাপামাপি ছাড়াই বুঝে গেছি তোমার উচ্চতার কাছে সুপারিগাছের উচ্চতা কিছুই না। চলো এখন যাই। আচ্ছা জনি, তুমি কি কখনও সাগর দেখতে গিয়েছো? জনি ছোট করে বলে-জ্বি না। জিতু বলে-কদিন পর যখন আমাদের স্কুল বন্ধ হবে, তখন একবার সাগর দেখতে যেও। তুমি যদি সাগর দেখতে যাও, আর যদি আমার পরামর্শ অনুযায়ী একটা কাজ করো, তাহলে তোমাকে দেখার জন্যে সাগরের পাড়ে পর্যটকদের ভিড় বেড়ে যাবে। সারাবিশ্ব থেকে পর্যটকরা দল বেঁধে আসবে আমাদের দেশে।
জিতুর কথার অর্থ এবং উদ্দেশ্য বুঝতে পারে না জনি। জিতু তার সঙ্গে আরো ঘনিষ্ট হয়। একটু আগে হাত ধরে হাঁটছিল, এখন তার কাঁধে হাত রেখে হাঁটে। তারপর স্কুলের কাছঅকাছি এসে বলে-সাগরের পাড়ে গিয়ে আমার পরামর্শ অনুযায়ী যে কাজটা করবে, সেটা হচ্ছে ধুম করে সাগরে নেমে পড়বে। নেমে একদম মাঝ সাগরে চলে যাবে। তখন যে দৃশ্যটা দেখা যাবে, এই দৃশ্য দেখার জন্যেই সারাবিশ্ব থেকে পর্যটকরা দল বেঁধে আমাদের দেশে আসবে। দেখা যাবে তুমি মাঝ সাগরে দাঁড়িয়ে আছো। আর সেখানে তোমার হাঁটু সমান পানি। চিন্তা করো ব্যাপারটা, একজন মানুষ সাগরে দাঁড়িয়ে আছে, সে তো ডুবছেই না, শুধু তার হাঁটুটুকু ডুবেছে। একটা মানুষ কী পরিমাণ লম্বা হলে এমন হতে পারে! পর্যটকদের জন্যে এরচেয়ে ইন্টারেস্টিং দৃশ্য….
-জিতু, আমি ক্লাসে যাবো।
-আমিও যাবো। তবে আমার পরামর্শটা মনে রাখবে কিন্তু।
জনি দ্রুত ক্লাসে চলে যায়। জিতু বাইরেই দাঁড়িয়ে থাকে। একা একা এখন সে কিছুক্ষণ হাসবে। জনি ক্লাসে গিয়ে কোণার বেঞ্চে বসলে ক্লাসের ফার্স্টবয় রাব্বি তার পাশে এসে বসে। জনিকে জিজ্ঞেস করে কেমন আছে। জনি ‘ভালো’ বলে এমন একটা হাসি দেয়, যার অর্থ সে ভালো নেই। রাব্বি গলার স্বর নিচু করে বলে-কী করবে বলো। আমাদের ক্লাসের ছেলেরা একটু এমনই। নতুন কাউকে পেলে তাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে ছাড়ে। তবে কয়েকটা দিন সহ্য করে থাকতে পারলে দেখবে ওরা তোমার আপন ভাইয়ের মত আপন হয়ে গেছে। আর শোনো, তুমি একটু বেশি লম্বা বলে মোটেও হীনমন্যতায় ভুগবে না। বরং মনে করবে এটা তোমার বাড়তি গুণ।
সেকেন্ড পিরিয়ডের স্যার ক্লাসে ঢোকেন। ছাত্র ছাত্রীরা তার সম্মানে উঠে দাঁড়ায়। এটা মতিন স্যারের ক্লাস। মতিন স্যার চোখে একটু কম দেখেন। বেশি দেখার জন্যে হাইপাওয়ারের চশমা পরেন। কিন্তু তাতে তেমন কাজ হয় না। বইয়ের লেখা ঠিকঠাক পড়তে পারলেও দূরের জিনিস তেমন স্পষ্ট দেখতে পান না। মতিন স্যারের রসবোধ প্রচন্ড। যেকোন জিনিস নিয়ে তিনি মজা করতে পারেন। হাসাতে হাসাতে ছাত্র ছাত্রীদের পেটে খিল ধরাতে পারেন। তবে রসিক হওয়ার কারণে ছাত্র ছাত্রীরা তাকে একটু কমই ভয় পায়। মতিন স্যার চেয়ারে বসে পায়ের উপর পা তুলতে তুলতে বলেন-বসো তোমরা। ছাত্র ছাত্রীরা সবাই বসে পড়ে। মতিন স্যার তার হাইপাওয়ারের চশমা দিয়ে দেখতে পান সবাই তার কথা মানেনি।
-এই ছেলে, আমি বসতে বললাম না? সবাই বসেছে, তুমি বসোনি কেন?
হাসির শব্দে ক্লাস কেঁপে ওঠে। জিতু বলে-স্যার, সে বসেই আছে। আপনার যদি কোন সন্দেহ থাকে, তাহলে তদন্ত করে দেখতে পারেন। স্যার চেয়ার ছেড়ে উঠে আসেন তদন্ত করার জন্যে। তদন্ত করে যখন দেখেন জিতুর কথা ঠিক, তখন স্যারের রসিকতা যেন উপছে পড়ে-তুমি তো মিয়া আমার বন্ধুর ভাত মারবে। আমার এক বন্ধু আছে বিরাট লম্বা। তার নাম তারেক। আমরা তাকে ডাকি-লম্বু তারেক। তুমি তো মিয়া লম্বু তারেকের চেয়েও লম্বু। হা হা হা। স্যারের হাসির সঙ্গে সবাই তাল মেলায়। তবে জিতুর মুখে এই মুহূর্তে কোন হাসি নেই। সে কিছু একটা ভাবছে।
জিতু ভাবছে ‘লম্বু’ শব্দটা নিয়ে। শব্দটা তার খুব মনে ধরেছে। সে দাঁড়িয়ে বলে-স্যার, আপনার বন্ধুর কাছ থেকে একটা জিনিস ধার করতে চাই। স্যার খানিকটা অবাক হলেন-আমার বন্ধুর কাছ থেকে ধার করতে চাও! জিনিসটা কী? টাকা পয়সা না তো? টাকা পয়সা ধার চাইলে আমার এই বন্ধু জীবনেও দেবে না। সে মহাকঞ্জুস। জিতু বলে-না স্যার, টাকা পয়সা না। তার কাছ থেকে তার ‘লম্বু’ উপাধিটা ধার করতে চাই। ধার করে আমাদের জনির নামের সঙ্গে জুড়ে দেবো। জনি হয়ে যাবে ‘লম্বু জনি’। হাসির শব্দে পুরো ক্লাস থরথরিয়ে উঠল। স্যারও হাসছেন। হাসতে হাসতেই বললেন-ঠিক আছে, আমি আমার বন্ধুকে জিজ্ঞেস করে দেখবো উপাধিটা সে ধার দিতে রাজি আছে কি না।
স্যার তার বন্ধুকে কবে জিজ্ঞেস করবেন, কবে অনুমতি মিলবে-এতদিন অপেক্ষা করার মত ধৈর্য নেই জিতুদের। তারা সেদিন থেকেই জনিকে ‘লম্বু জনি’ নামে ডাকতে শুরু করে। স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে জিতু বলে-শোনো জনি, তোমার কিন্তু একটা কাজ বেড়ে গেছে। কালই তুমি জন্মনিবন্ধন অফিসে যাবে। গিয়ে করবে কী, তোমার ‘জয়নাল আবেদিন জনি’ নামটা কেটে ‘লম্বু জনি’ নামটা বসিয়ে আনবে। কী, মনে থাকবে? কথাগুলো সিরিয়াসলি বলতে গিয়েও ফিক করে হেসে ফেলে জিতু।
।। তিন।।
এক মাস পর। জনি এখন আর আগের জনি নেই। তার জড়তা কেটে গেছে। সংকোচ কমে গেছে। ঠাট্টা মশকরা সব গা সওয়া হয়ে গেছে। আগে কেউ তাকে ‘লম্বু জনি’ ডাকলে সে লজ্জায় মিইয়ে যেত। এখন লাজ শরমের ধার ধারে না। বরং ডাক দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সানন্দে সাড়া দেয়-জ্বি, বলো। তার এই সানন্দে সাড়া দেওয়া দেখে একটু মন খারাপই হয় জিতুদের। মনে মনে বলে-ধুর বেটা, আগের মত লজ্জা পাস না কেন? খেপিস না কেন? লজ্জা না পেলে, না খেপলে এইসব নামে ডেকে মজা আছে? খেপে গিয়ে আমাদের তাড়া করবি, স্যারের কাছে নালিশ করবি, তোর লম্বু নামটা আরো জানাজানি হবে, সবার মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়বে-তবেই না মজা।
জিতুদের দমানোর জন্যে ভালো একটা বুদ্ধি বের করেছে জনি। জিতুর মত আরো যারা তাকে বেশি বেশি ‘লম্বু’ ডাকে, তাদের জন্যে সে একটা করে উপাধি তৈরি করেছে। জিতু বেশ হালকা পাতলা। গায়ে কোন মাংস নেই। বুকের হাড়গুলো দূর থেকে দেখা যায়। তাই জিতুর উপাধি দিয়েছে-কাঠবডি। জিতু যখনই সবার সামনে তাকে লম্বু জনি বলে ডাকে, সেও বলে বসে-কী কাঠবডি জিতু, কিছু বলবে? জিতুর মুখ পানসে হয়ে যায়। রবিন বেশ মোটা। সাইজে ছোটখাটো একটা হাতি। রবিনের উপাধি-এলিফ্যান্ট। জনি তাকে এলিফ্যান্ট রবিন নামে সম্বোধন করলে লজ্জায় সে তার সামনে থেকে পালানোর জন্যে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
জনি এখন জিতুদের দলেরই একজন। তাকে ছাড়া জিতুরা কোথাও যায় না, কিছু করে না। জনিকে সঙ্গে রাখলে তাদের একটা লাভও আছে। তারা নিরাপদ বোধ করে। এমনিতে তাদের শত্রুর অভাব নেই। আশপাশের স্কুলের অনেকের সঙ্গেই বিভিন্ন সময় তাদের ঝগড়াঝাটি হয়েছে। সুযোগমত পেলেই তারা তাদের মারবে। মারতে না পারলে ধাওয়া হলেও করবে। কিন্তু জনি সঙ্গে থাকলে সেই সাহস তারা পাবে না। জনির সাইজ দেখেই ভয় পেয়ে যাবে। ভাববে-এই বিশাল সাইজের ছেলেটা যদি একবার রেগে যায়, তাহলে সবাইকে তুলোধুনো করে ছাড়বে। জিতুরা যখন দল বেধে কোথাও যায়, তখন জনিকে সামনে রাখে। যাতে ঝড় ঝাপটা এলে সে সামাল দিতে পারে। জনিও খুশি মনেই আগে আগে হাঁটে। তার মধ্যে নেতা নেতা একটা ভাব কাজ করে।
জনিকে সাথে নিয়ে ঘুরলে জিতুদের আরো একটা লাভ আছে। কখনও ক্ষুধা লাগে না। মজার মজার ফল খেতে পারে। কারো গাছে হয়তো আম পেকে ঝুলে আছে। অথবা কালো কালো জাম দেখা যাচ্ছে। গাছে উঠে পাড়তে পাড়তে মালিক চলে আসবে। ঢিল ছুড়ে পাড়তে গেলেও মালিক টের পেয়ে যাবে। জনি সাথে থাকলে গাছে ওঠারও দরকার হয় না, ঢিল ছোড়ারও দরকার হয় না। হাত বাড়ালেই ডাল ছুঁতে পারে। সে ডাল টেনে ধরে। যার যত ইচ্ছা আম পেড়ে খায়। এ সময় যদি গাছের মালিক টের পেয়েও যায়, জনির দৌড়ে পালাতে কোন সমস্যা হয় না। কারণ তার পা লম্বা লম্বা। মালিক তিন কদমে যতটুকু এগোয়, জনি সেটুকু এক কদমেই এগোয়।
-এই ছেলে! স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে জনিকে একজন ডাক দেয় পেছন থেকে।
-আমাকে বলছেন?
-জ্বি। তুমি একটু আমার সাথে চলো তো।
-কোথায়? এবার লোকটার দিকে ভালোভাবে তাকায় জনি। পরিচিত মনে হচ্ছে। কিন্তু কোথায় দেখেছে মনে করতে পারছে না।
-আসো।
-কোথায় যাবো। এছাড়া আপনাকে তো আমি চিনতেই পারছি না। কে আপনি?
-চিনতে পারছো না? একটু মনে করার চেষ্টা করো।
জনি এবার চিনতে পারে লোকটাকে। তার বুক ভয়ে ঢিপঢিপ করতে থাকে। এই লোকটা নদীরপাড়ের আমগাছটা মালিক। গত পরশুদিন যখন জনি আমগাছটার ডাল টেনে ধরে রেখেছিল আর জিতুরা আম পেড়ে খাচ্ছিল, তখন লোকটা হইচই করতে করতে তাদের দিকে তেড়ে আসছিল। কিন্তু ধরতে পারেনি। আজ নিশ্চয়ই ধরে কঠিন সাজা দেবে। জনি দৌড় দেওয়ার সুযোগ খুঁজছে। কিন্তু কোন সুযোগ নেই। কারণ লোকটা এগুতে এগুতে তার একদম কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। দৌড় দিতে চাইলেই খপ করে শার্টের কলার চেপে ধরে ফেলতে পারবে। এছাড়া লোকটার সঙ্গে আরো যে দুজন ছিল, তারা তাকে অনেকটা ঘিরে দাঁড়িয়েছে।
-আমাকে মাফ করে দেন।
-কোন মাফ নেই।
-আমি আর কোনোদিন আপনার গাছ থেকে ফল পাড়বো না।
-সেটা পরে দেখা যাবে। এখন চলো।
জনির কোন দোহাইই মানল না লোকটা। জনিকে তার বাড়ি নিয়ে গেল। সে এখন লোকটার বাড়ির উঠোনে দাঁড়ানো। উঠোনের চারপাশে দেয়াল। একদিকে ছোট্ট একটা গেট। তাও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। জনি নিজের হাত পা-কে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছে না। হাত পা থরথরিয়ে কেঁপেই চলেছে। সে কোনদিন বাইরের কারো হাতে মার খায়নি। আজ খেতেই হবে। জনি মার খাওয়ার জন্যে তৈরি হয়। কে জানে তারা তাকে এক দফা মেরেই ছেড়ে দেবে কিনা। নাকি মারার পর খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রেখে বাড়িতে খবর দেবে। বাড়িতে খবর দিলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। বাবা তাকে বাড়ি থেকে বের দেবেন। আর ভাইয়ার হাতে ধরা পড়লে পিটিয়ে আরো কয়েক ইঞ্চি লম্বা বানিয়ে ফেলবে।
-আংকেল, আমি একটা অনুরোধ করবো। রাখবেন?
-কী অনুরোধ?
-আপনারা আমাকে যত মারতে চান, মারবেন। তবু দয়া করে আমার বাড়িতে খবর দেবেন না।
-বুঝলাম না তোমার কথা।
জনি লোকটাকে তার কথাটা বোঝানোর আগেই তার সামনে একটা ছেলে এসে দাঁড়ায়। ছেলেটার হাতে ধারালো একটা দা। এই দা দিয়ে এক কোপ দিলে মাথা আলগা হয়ে যাবে। ভয়ে জনির কেমন যেন লাগছে। হয়তো সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলছে। লোকটা জনিকে বলল-নাও, দাটা হাতে নাও। জনি অবাক হয়। সে দা হাতে নেবে কেন? দা তো আনা হয়েছে তাকে কোপানোর জন্যে। সে লোকটার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলে লোকটা তাকে ধমকের সুরে বলে-কী ব্যাপার, কথা কানে যাচ্ছে না? দা-টা নাও। আমার কাজটা করে দাও। কাজটা তোমার জন্যে কঠিন কিছুই না। পাঁচ মিনিট লাগবে। এই নাও। ছেলেটার হাত থেকে দা নিয়ে জনির হাতে দেয় লোকটা।
-আমি কিছুই বুঝতে পারছি না আংকেল।
-এই যে উঠোনের কোণায় নারকেল গাছটা দেখছো, এটা আমার খুবই প্রিয় নারকেল গাছ। নিজহাতে লাগিয়েছিলাম। তাই এই গাছে আমি সহজে কাউকে উঠতে দিতে চাই না। কারণ গাছে উঠলে পাতা নষ্ট হয়, কচি ডাবের ক্ষতি হয়। কিন্তু এতোদিন লোকজন না উঠিয়ে উপায় ছিল না। না ওঠালে নারকেল পাড়বো কীভাবে। সেদিন তোমাকে যখন মাটিতে দাঁড়িয়ে আমগাছের ডাল টেনে ধরতে দেখলাম, তখনই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম তোমাকে দিয়ে নারকেল পাড়াবো। তুমি মাটিতে দাঁড়িয়েই নারকেল পাড়তে পারবে। গাছেও উঠতে হবে না, আমার গাছের কোন ক্ষতিও হবে না। শুরু করো, শুরু করো। মোট ছয়টা নারকেল পাড়বে।
জনি বড় করে একটা নিঃশ্বাস ছাড়ে। স্বস্তির নিঃশ্বাস। মনে মনে নিজের উপর রাগও করে সে। লোকে বলে লম্বা মানুষের নাকি হাঁটুর নিচে বুদ্ধি থাকে। তার হয়তো হাঁটুর নিচেই বুদ্ধি। নইলে খামোখা এতো ভয় পাবে কেন। নারকেলগাছটা মাঝারি আকারের। তবে জনি দুই পায়ে বুড়ো আঙুলের উপর ভর করে একটু উঁকি দিলেই নাগাল পেয়ে যাবে। সে দায়ের আগার অংশের ধার পরীক্ষা করতে করতে নারকেলগাছের গোড়ায় গিয়ে দাঁড়ায়। তারপর উঁকি নিয়ে লম্বা হওয়ার চেষ্টা করতেই কেউ একজন তাকে থামতে বলে। বলে দুই মিনিট অপেক্ষা করার জন্যে। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতেই জনি দেখতে পায় জিন্সের প্যান্ট পরা একজন লোক বেরিয়ে আসছে ঘর থেকে। তার হাতে ক্যামেরা। ক্যামেরাটা বেশ বড়।
।। চার।।
-এইবার তুমি নারকেল পাড়ো। তুমি নারকেল পাড়বে, আমি তোমার ছবি তুলবো।
-ছবি কেন?
-পরে বলবো। এখন নারকেল পাড়ো।
-পাড়বো তো, কিন্তু…
-আহা কিন্তু কিন্তু করো না তো! যাও।
জনি নারকেল পাড়ে। লোকটা সেই দৃশ্য ক্যামেরাবন্দী করে। নারকেল পাড়া শেষ হলে জনি লোকটার দিকে প্রশ্নবোধক চোখে তাকিয়ে থাকে। তবে লোকটা এখন তাকিয়ে আছে তার ক্যামেরার দিকে। ছবিগুলো কেমন উঠেছে পরীক্ষা করছে। পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষে সে জনির দিকে তাকায়-ছবিগুলো ভালো এসেছে। বুঝলে, দৃশ্য ভালো হলে ছবি ভালো না হয়ে পারে না। চলো, ঘরে চলো। তোমার সঙ্গে কথা বলি। লোকটার সঙ্গে ঘরে ঢোকে জনি। লোকটা খাটে পা তুলে বসে। আর জনি বসে চেয়ারে। সে লোকটার আপাদমস্তক চোখ বুলাচ্ছে। আর ভাবছে মতলব কী লোকটার? নারকেল পাড়ার দৃশ্যের ছবি তুলে রাখল কেন? এই ছবি দেখিয়ে সবার সামনে তাকে চোর বানাবে না তো! নারকেলচোর।
-তোমার কি কোন আইডিয়া আছে ছবিটা আমি কেন তুলেছি?
-না।
-দেখো না আইডিয়া করতে পারো কিনা।
-আমি পারছি না। আপনি বলেন।
-বলছি। তার আগে এই জিনিসটা দেখো।
লোকটা তার মানিব্যাগ থেকে একটা কার্ড বের করে জনির হাতে দেয়। ভিজিটিং কার্ড। কার্ডের একপাশে লেখা-শাহেদুর রহমান। বিশেষ প্রতিবেদক। আর কার্ডটার মাঝখানে লেখা-দৈনিক সকালের সূর্য। লোকটা জনির দিকে একটু ঝুঁকে এসে বলে-আমি রিপোর্টার হলেও ফটোগ্রাফারের কাজও করি। আসলে ভালো একটা দৃশ্যের ছবি নিজে তুলে নিতে না পারলে ছবিটা মনমত হয় না। এটা আমার মামার বাড়ি। যিনি তোমাকে রাস্তা থেকে ডেকে আনলেন, তিনি আমার মামা। বেড়াতে এসে যখন শুনলাম একটা ছেলে মাটিতে দাঁড়িয়ে থেকেই গাছের উঁচু ডাল নাগাল পায়, তখন আমার কৌতূহল জন্মাল। ভাবলাম তোমাকে নিয়ে একটা রিপোর্ট করবো। আমি বিচিত্র জিনিস নিয়ে রিপোর্ট করতে মজা পাই।
জনির মুখে এবার হাসি ফোটে। পত্রিকায় তাকে নিয়ে লেখা হবে, তার ছবি ছাপানো হবে-ভাবতেই কেমন যেন লাগছে তার। তবে এখন সে খুব বেশি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে চায় না। আগে ছাপুক, তারপর। লোকটা তার পকেট থেকে জনিকে এক টুকরো কাগজ আর কলম দিয়ে বলে-যেকোন একটা ফোন নাম্বার দাও। যেখানে ফোন করলে তোমাকে সহজে পাওয়া যাবে। জনি দুটো ফোন নাম্বার লিখে দেয়। একটা তার বাবার। আরেকটা ভাইয়ার। লোকটা কাগজের টুকরোটা ভাঁজ করে তার কাঁধ ব্যাগের পকেটে ঢোকাতে ঢোকাতে বলে-তুমি যদি ফোন করতে চাও, কার্ডে আমার নাম্বার আছে। আর তুমি আমাকে ‘ভাইয়া’ ডাকতে পারো। আবার শাহেদ ভাইও ডাকতে পারো।
-আচ্ছা।
-তাহলে যাও এখন। নিউজটা যেদিন ছাপা হবে, আমি তোমাকে ফোন করে জানাবো।
শাহেদ ভাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে চলে আসে জনি। পরদিন স্কুলে এসে জিতুদের কাছে পুরো ঘটনা বর্ণনা করে। জিতু বলে-তোর ছবি যেদিন ছাপা হবে, সেদিন পত্রিকা বিক্রি করতে হকারদের একটু সমস্যা হয়ে যাবে। কেন, সমস্যা হবে কেন? জিতু সমস্যার কারণ ব্যাখ্যা করে-তোর সাইজ বিরাট, তোর ছবিও হবে বিরাট। এতো বিরাট ছবি তো আর নরমাল পত্রিকায় ধরবে না। কী করতে হবে? পত্রিকার সাইজ বড় করতে হবে। পত্রিকা আরো লম্বা বানাতে হবে। এতো লম্বা পত্রিকা নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে হকারদের সমস্যা হবে না? দেখা যাবে পত্রিকার এক মাথা হকারের হাতে, আরেক মাথা রাস্তায় গড়াগড়ি খাচ্ছে। রাস্তায় যদি গোবর থাকে, তাহলে কী অবস্থা হবে চিন্তা কর।
জনি চিন্তা করার অভিনয় করে। তারপর বলে-তোর কথায় যুক্তি আছেরে কাঠবডি। আসলে আমার ছবি না ছেপে যদি তোর ছবি ছাপে, তাহলে কোন সমস্যাই থাকবে না। বরং আরো সুবিধা হবে হকারদের। তুই চিকনা। তাই তোর ছবি যেদিন ছাপবে, সেদিন চিকন সাইজের পত্রিকা বের করলেই চলবে। আর চিকন সাইজের পত্রিকা নিয়ে রাস্তায় ঘুরে খুব আরাম পাবে হকাররা। কী বলেন কাঠবডি সাহেব? জিতু চুপসে যায়। প্রসঙ্গ পাল্টানোর জন্যে বলে-শুনলাম কলেজ মাঠে নাকি কনসার্ট হবে? যাবি নাকি? জনি আনন্দে গদগদ হয়ে বলে-যাবো না মানে? অবশ্যই যাবো। খালি বল কনসার্টটা কবে। আমি সকালে গিয়ে বসে থাকবো। দেরি করে গেলে আবার দাঁড়ানোর জায়গা পাওয়া যায় না।
-সকালে গিয়ে কী করবি। কনসার্ট তো হবে সন্ধ্যায়। তবে দুপুরের দিকেই চলে যাওয়া যেতে পারে। তোর বাসা থেকে কোন সমস্যা করবে না তো?
-কী রকম?
-মানে তোকে যদি কনসার্টে যেতে না দেয়?
-আরে না, দেবে। এখন বড় হয়েছি না?
ঘণ্টা বাজে। জনিরা ক্লাসে গিয়ে বসে। স্যার আসেন। অন্যদিন স্যার ক্লাসে এসেই রোল কল করেন। কিন্তু আজ রোল কল করলেন না। টেবিলে দুই হাতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে বলতে লাগলেন-হঠাৎ করেই আমরা জানতে পেরেছি ডিসি সাহেব স্কুল ভিজিটে বের হয়েছেন। বেশ কটা স্কুল নাকি তিনি ভিজিট করবেন। তবে কোন কোন স্কুল করবেন, সেটা কেউ বলতে পারছে না। আমরা ধারণা করছি আমাদের স্কুলেও আসতে পারেন। যদি আসেন, তাহলে একটা ক্লাসও বাদ রাখবেন না। প্রতিটা ক্লাসেই যাবেন। এটা তার বৈশিষ্ট্য। তাই তোমাদের সবাইকে রেডি থাকতে হবে। উনি কোন প্রশ্ন করলে ঠিকঠাক মত উত্তর দিতে হবে। এমন কোন আচরণ করা যাবে না, যাতে তিনি অসন্তুষ্ট হতে পারেন।
স্যারের ধারণা সত্যি হয়। ডিসি সাহেব ঠিকই জনিদের স্কুল ভিজিটে আসেন। প্রথমে তিনি অফিসরুমে ঢোকেন। তবে পাঁচ মিনিটের বেশি বসেন না। শুরু করেন ক্লাসে ক্লাসে ঘোরা। সবার আগে ঢোকেন টেনের ক্লাসরুমে। এখানে থাকেন প্রায় দশ মিনিট। তারপরই যান জনিদের ক্লাসে। ডিসি সাহেবের সম্মানে সবাই উঠে দাঁড়ায় এবং সালাম দেয়। বাদ থাকে কেবল একজন। জনি। জনি না দাঁড়িয়ে হাই বেঞ্চের নিচে মাথা লুকিয়ে রাখে। ডিসি সাহেব যেখানে দাঁড়িয়েছেন, সেখান থেকে জনিকে দেখা যায় না। কিন্তু তিনি কী মনে করে যেন কয়েক হাত সামনে যান। একজন ছাত্রকে অস্বাভাবিক ভঙ্গিতে বসে থাকতে দেখে তিনি অবাক হন। ক্লাস টিচারের সামনেও তো কেউ এমনটা করে না। অথচ তিনি একজন ডিসি। তার সামনে এই ছেলে এভাবে বসার সাহস কীভাবে পেল।
ডিসি সাহেব জনিকে হাইবেঞ্চের নিচ থেকে মাথা তুলতে বলেন। জনি মাথা তোলে কিন্তু দাঁড়ায় না। এছাড়া মুখটা এমনভাবে রাখে, ডিসি সাহেব স্পষ্ট দেখতে পান না। রেগে যান ডিসি সাহেব। কোনো ছাত্রকে তিনি ডাকবেন, আর সেই ছাত্র বসা থেকে উঠে দাঁড়াবে না-কল্পনা করা যায়! ডিসি সাহেব জনিকে কড়া আদেশ দেন দাঁড়ানোর জন্যে। এবার জনি না দাঁড়িয়ে পারে না। তার মুখটাও এখন স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ডিসি সাহেব অনেকক্ষণ ধরে তাকিয়ে থাকেন জনির মুখের দিকে। তারপর বিস্ময়ের সঙ্গে বলেন-তুমি জনি না? কোন উত্তর আসে না। ডিসি সাহেব আবার বলেন-তুমি জনি কিনা বলো। এবার জনি উত্তর দেয়-জ্বি স্যার।
-স্যার, আপনি ওকে চেনেন? মতিন স্যার জিজ্ঞেস করেন।
-ওকে না চেনার কোনো কারণ নেই। এখন পর্যন্ত আমি ওকে পাঁচ সাতটা স্কুলে দেখেছি। আজ এই স্কুলে তো কাল ঐ স্কুলে। কোন স্কুলেই ও স্থায়ী হয় না। ওর মত আজব ছাত্র না আমি আমার ছাত্রজীবনে দেখেছি, না আমার চাকরি জীবনে দেখেছি।
সব ক্লাস পরিদর্শন শেষে ডিসি সাহেব চলে যান। আর এদিকে শুরু হয় জনিকে নিয়ে চিন্তা ভাবনা। হেডস্যার মনসুর স্যারকে দায়িত্ব দেন জনির বারবার স্কুল বদলানোর কারণ খুঁজে বের করার জন্যে।

দয়াকরে লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০১৮-২০১৯ নবরঙ
Design BY NewsTheme