লেখা আহবান
প্রিয় লেখক বন্ধু, আপনার লেখা সবচেয়ে সুন্দর উপন্যাস, সায়েন্স ফিকশন, ভ্রমণকাহিনী, ফিচার, স্বাস্থ্য কথা ইত্যাদি পাঠিয়ে দিন এই মেইলে– noborongpotrika@gmail.com
সেদিন পহেলা বৈশাখ

সেদিন পহেলা বৈশাখ

মাহাথির আরাফাত

সেদিন ছিল বৈশাখ মাসের প্রথম দিন। চৈত্রের রক্তমাখা স্বপ্নের ভেলা অবসন্ন হয়েছিল নিঝুম নিরালায়। তেমনি মৃত্তিকা শৃংখলে বাণীর সুরে সুরে সংগীত নির্ঝরে এসেছিল নতুন বছর পল্লি বাংলার ঘরে নিকুঞ্জের কাঞ্চনমালায়। সেই দিনটিই যে বাঙালির জীবনে অনেক গুরুত্ববহ ছিল তা আমি জানতাম না। আমার বয়স তখন সাত। বাংলা বারোটা মাস নিয়ে বেশি ঘাঁটাতাম না। ইংরেজি তারিখই ব্যবহার করতাম ইচ্ছে মতো। আমাকে পহেলা বৈশাখ সম্পর্কে প্রথমে জ্ঞান দিয়েছিলেন মঈন মামা। তিনিই সেদিন বড় সাইজের দুটি ব্যাগ নিয়ে হাজির। ভীষণ ভারী ভারী ব্যাগ। বেচারা মামা একেবারে হাঁপিয়ে উঠেছিলেন। মামাকে দেখে আমি একটা গগণবিদারী চিৎকার দিয়েছিলাম। চিৎকারে আমার সব ভাই-বোন মুহূর্তের মধ্যে হাজির। মা যখন ব্যাগ খুলতে গিয়েছিলেন, তখন আমাদের আনন্দের সীমা রইল না। উড়কি ধানের মুড়কি, বিন্নি ধানের খই, নানান বাহারী খেলনা আরও কত কি।

বিকেলের খাওয়া-দাওয়া শেষ করার পর মঈন মামা বললেন, ‘আজ তোদের নিয়ে মেলায় যাব, তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নে।’ আমার সেদিনই ছিল বৈশাখী মেলায় প্রথম যাত্রা। আমরা চার ভাই-বোন। মামা আমাদের সবাইকে মেলায় নিতে রাজি। সবচেয়ে ছোট যে তার বয়স চার। সেও মেলায় যাবে বলে ঠিক করল। বাবা ওকে অনেক ভয় দেখিয়েছিলেন। মেলায় হারিয়ে যাওয়ার ভয় আছে, আর আছে কালো কালো ভূত। ভূতের ভয়ে ওকে কাবু করতে হয়েছিল। আমার মনেও ভূতের ভয় কাজ করেছিল। তবুও গেলাম, কারণ আমি আগে কখনো মেলা দেখিনি।

আমরা দুই কিলোমিটার রাস্তা পায়ে হেঁটে মেলায় গিয়েছিলাম। মানুষের ভিড়ের কারণে পা রাখার জায়গাটাও ছিল না। আমরা তিনজন ছোট মানুষ। মামার মাত্র দুটি হাত। তাই আমাকে উনার ঘাড়ে চড়ালেন। বাকি দুইজন দুই হাতে শক্তভাবে ধরা। সমস্ত মেলাটাই ঘুরে দেখলাম। জীবনে এত আনন্দ আগে কখনই পাইনি। বানর খেলা, পুতুল নাচ, নাগরদোলা, আর এক পাশে বাউল গানের আসর মেলাকে পূর্ণতা দান করেছিল। মাটির জিনিসপত্রে ভরা ছিল চতুর্দিক। আপা মাটির পুতুল কিনেছিল চারটা। সেগুলো ছিল আমার হাতে। হাত থেকে পড়ে গিয়ে ভেঙে ছিল দুইটা। মঈন মামা আবার তাকে কিনে দিল। আমাকে কিনে দিয়েছিল লম্বা একটা প্লাস্টিকের বাঁশি। আমার বড় ভাইকে একটা খেলনা ঢোল। ও ওটা দেখে ভীষণ অস্থির হয়ে গিয়েছিল।

সেদিনটি যে আমার জীবনের স্মরণীয় দিন তার আরেকটি কারণ আছে, ভীষণ চমকপ্রদ। আমি ছোট বলে সারাক্ষণ মামার ঘাড়ে ছিলাম। নাগরদোলায় চড়ার পর মামা আর আমাকে ঘাড়ে নিলেন না। এক পর্যায়ে আমার চোখ আটকে গেল এক সাপুড়ের সাপ প্রদর্শনীতে। আমি আপন মনে সাপ খেলা দেখছি। দুনিয়ার আর কোনো কিছুর দিকে খেয়াল নেই। মঈন মামা আমাকে ফেলে চলে গেলেন। তিনি মনে করেছিলেন আমি আপার সাথে আছি। সাপুড়ে যখন সবার কাছে দুই চার টাকা চাইল, তখন আমার হুঁশ হলো। ভিড় ঠেলে এগিয়ে এসে দেখি মামা আর ওরা একেবারে হাওয়া। এদিক সেদিক খুঁজতে লাগলাম, কিন্তু কোথাও ওরা ছিল না। ভয়ে আমি একেবারে কাঠ হয়ে গেলাম। মুখটা শুকিয়ে গিয়েছিল। একটু পানি খেলাম চা স্টল থেকে। আর নিজের মতো করে স্বাধীনভাবে মেলা দেখতে লাগলাম। সন্ধ্যার আগে বাড়ি ফিরে এলাম বাঁশি হাতে পেঁ পুঁ করতে করতে।

বাড়িতে এসে দেখি মামারা এখনও আসেনি। সবাই আমাকে বলল যে আমি একা কেন? আমি সব খুলে বললাম যে আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম। তাই ওদের ফেলে চলে এসেছি। রাত আটটায় ওরা আসলো কাঁদতে কাঁদতে। আপা আর ভাইয়ের চোখে মুখে ভয় এবং কান্নার চিহ্ন ফুটে ওঠল। মামা তো ভয়ে কথাই বলতে পারছিলেন না। ওরা সবাই উঠোনে এসে দাঁড়িয়েছিল। সবাই নিথর হয়েছিল। আমি দরজার আড়াল থেকে সব দেখছিলাম। মা ওদের সবাইকে বলল যে আমি অনেক আগেই চলে এসেছি। এ কথা শুনার পর ওরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। তারপর আপা আর ভাই আমাকে কিছু উত্তম মধ্যম দিয়েছিল। এটা অবশ্য ভালোবাসারই বহিঃপ্রকাশ ছিল।

দয়াকরে লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০১৮ নবরঙ
Design BY NewsTheme