লেখা আহবান
প্রিয় লেখক বন্ধু, আপনার লেখা সবচেয়ে সুন্দর উপন্যাস, সায়েন্স ফিকশন, ভ্রমণকাহিনী, ফিচার, স্বাস্থ্য কথা ইত্যাদি পাঠিয়ে দিন এই মেইলে– noborongpotrika@gmail.com

উদ্ধার

করিম সুমন 

মিনহাজ নামের দশ-বারো বছরের ছেলেটি তার পঙ্গু মা, ছোট একটি বোন এবং বাবাকে নিয়ে চুড়িহাট্টার একটি রুম ভাড়া করে থাকে। অভাবের সংসারে পরিবারকে সহযোগিতা করতে তাকে একটি কারখানায় কাজ করতে হয়। পাশাপাশি ঝরে পড়া শিশুদের জন্য এনজিও পরিচালিত একটি স্কুলে চতূর্থ শ্রেণীতে পড়ে। ক্লাস হয় বিকেলবেলা। বাবা একটি বাইণ্ডিং কারখানার শ্রমিক। দুজনের আয় দিয়ে তাদের কোনমতে চলে যায়। 

সেদিনও ক্লাস করে এসে ওদের বাসার সামনের গলিতে দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ পাশের ভবনে বিকট শব্দ শুনে সেদিকে তাকাতেই দেখে আগুন। মানুষ আগুন আগুন চিৎকার করছে আর যে যেদিকে পারছে দৌড়ে পালাচ্ছে। তার পঙ্গু মায়ের কথা মনে পড়ে যায়। পড়তে যাবার সময়ও ওকে ডেকে বলেছিলো,  “বাবা, তাড়াতাড়ি ফিরে আসিস” দুবছর বয়সী ছোট্ট বোনটি তাকে বলেছিলো,  “ভাইয়া, মজা খামু।”

সে আর সময় নষ্ট না করে দৌড়ে তাদের বাসায় যায়। খানিক চিন্তা করে নেয়, মাকে কিভাবে বের করে নেয়া যায়। ও তো নিজেই ছোট মানুষ। মাকে কোলে তোলাতো ওর পক্ষে সম্ভব নয়। তবুও শেষ শক্তি দিয়ে চলন শক্তি রহিত মাকে অনেক কষ্টে কোলে তুলে অনেকটা ছেচড়াতে ছেচড়াতে বাড়ির বাইরে নিয়ে রাখে। এরইমাঝে আগুন তাদের বাসার খুব কাছে চলে এসেছে। মাকে একটু দূরে নিরাপদ জায়গায় রেখে আবার যায় তার ছোট বোনটিকে আনতে। ঘরের ভিতরে ঢোকার সময়ই আগুনের আঁচ তার গায়ে লাগে। ঘরে ঢুকার সাথে সাথে পাশের রুমে জমা করে রাখা কেমিকেলে আগুন লেগে বিকট শব্দে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। মিনহাজ আর তার ছোট্ট বোনটিকে নিয়ে ফিরে আসতে পারে না। ওদের ভাগ্যে কী ঘটেছে কেউ বলতে পারে না। 

অসুস্থ মা তার দুই সন্তানকে হারিয়ে গড়াগড়ি করে আগুনের লেলিহান শিখায় আত্মবলি দিতে এগিয়ে যান আর চিৎকার করে বলেন, “তোমরা আমার বাবারে আইনা দাও। আমার বাবা আমারে কেন বাঁচাইলো। আমি অহন কেমনে বাঁচুৃম,  কারে লইয়া বাঁচুম?”


লোকমুখে চকবাজারের অগ্নিকাণ্ডের খবর শুনে ওর বাবা তার কারখানা থেকে পাগলের মত ছুটে আসে। কিন্তু ততোক্ষণে সব শেষ। তাদের বাসাটা আগুনের লেলিহান শিখা পুরোপুরি গ্রাস করে নিয়েছে। তিনি তার পরিবারের লোকদেরকে খুঁজতে থাকেন। পরিচিত যাকে সামনে পান তাকেই জিজ্ঞাসা করেন। অনেক খোঁজাখুঁজির পরে তার স্ত্রীকে পান বাসার অদূরে একটি গলিতে অজ্ঞান অবস্থায়। ততক্ষণে মিডিয়ার লোক,  প্রশাসনের লোক এলাকা ঘিরে ফেলেছে। 

ফায়ার ব্রিগেডের লোকেরা আগুন নেভানোর প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু ভবনগুলোতে প্রচুর পরিমান রাসায়নিক দ্রব্য, পারফিউম ইত্যাদি মজুদ থাকায় আগুনের তীব্রতা কিছুতেই কমছে না, বরং বেড়েই চলছে। 

প্রতিবেশী লোকদের সহায়তায় তার স্ত্রীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো। প্রাথমিক চিকিৎসার পরে মা কিছুটা সুস্থ হলে,
তার ছেলের উদ্ধার তৎপরতা চালাতে গিয়ে বোনকে নিয়ে আর ফিরে না আসার কথা শুনে বাবাও জ্ঞান হারালেন। এতোক্ষণে অগ্নিদগ্ধ মানুষে হাসপাতাল ভরে গেছে। কান্নাকাটি, আহাজারীতে হাসপাতালের বাতাস ভারি হয়ে গেছে। আপনজনের খোঁজে সবাই হাসপাতালে ভিড় করছে। 

একদিন পর আগুন নিয়ন্ত্রণে এলে একে অপরকে জড়িয়ে ধরা দুটি শিশুর পোড়া লাশ মিনহাজদের ঘরের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়। ধারণা করা হয় এটিই মিনহাজ ও তার বোনের লাশ। পরে ডি এন এ পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়ার পর তাদের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।  

এতো এতো মৃত্যুর মিছিলেও মিনহাজের এই বীরত্বপূর্ণ অাত্মত্যাগের কাহিনী সবার মুখে মুখে। যে নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে মা-বোনকে বাঁচাতে আগুনে ঝাপিয়ে পড়তে পারে। 

দয়াকরে লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০১৮ নবরঙ
Design BY NewsTheme