লেখা আহবান
প্রিয় লেখক বন্ধু, আপনার লেখা সবচেয়ে সুন্দর উপন্যাস, সায়েন্স ফিকশন, ভ্রমণকাহিনী, ফিচার, স্বাস্থ্য কথা ইত্যাদি পাঠিয়ে দিন এই মেইলে– noborongpotrika@gmail.com
তৃপ্ত নিঃশ্বাস- আহম্মদ রুবাইয়্যাত ইবনে সামছ

তৃপ্ত নিঃশ্বাস- আহম্মদ রুবাইয়্যাত ইবনে সামছ

মার্চ মাস আসলেই তাসফিয়ার আনন্দের সীমা থাকে না। প্রতি বছরের ২৬’শে মার্চ তাদের স্কুলে সুন্দর অনুষ্ঠান হয়। ত্রিভুজ আকৃতির লাল-নীল কাগজ, স্টেজ আর প্যান্ডেলে পুরো স্কুল অন্যরকম সাজে সজ্জিত হয়। সে এবার ক্লাস সিক্সে উঠেছে। নতুন স্কুলের অনুষ্ঠান কেমন হবে তা নিয়ে তার ভাবনার সীমা নেই।

মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে বিভিন্ন প্রতিযোগীতার আয়োজন করা হয়। সমস্ত স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে। অনুষ্ঠানের সপ্তাহখানেক আগেই পড়াশুনার চাপ কমে যায়। স্যারদের তত্বাবধানে চলে রিহারসেল। তাসফিয়া ঠিক করেছে সে অংক প্রতিযোগীতা, কবিতা আবৃতি ও যেমন খুশি তেমন সাজ এই তিনটি ইভেন্টে অংশগ্রহণ করবে। তাসফিয়ার আম্মু সংস্কৃতিমনা মানুষ। ছাত্রী জীবনে সংস্কৃতির চর্চায় বেশ সক্রিয় ছিলেন। মেয়েও মায়ের ধারা পেয়েছে।

আজ ২৬’শে মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবস। ইতিমধ্যে তাসফিয়া অংক প্রতিযোগীতায় প্রথম ও কবিতা আবৃতিতে তৃতীয় হয়েছে। এবার যেমন খুশি তেমন সাজের পালা। আধাপাকা চুল এবং সাদা শাড়িতে আপদমস্তকে একজন বুড়ীমা। তাসফিয়া অভিনয় করবে শহীদ মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী হিসাবে। আর তার ক্লাসের পিচ্চি ছেলেটা, তার পঙ্গু ছেলের চরিত্রে। এবারের প্রতিযোগী তাসফিয়া জামান, ৬ষ্ঠ শ্রেণী।

তাসফিয়া–
আজকের এই মহান দিনে, আমার জীবনের সবচেয়ে স্মৃতিময় ঘটনাটা আপনাদের সাথে ভাগাভাগি করতে চাই। স্মৃতিটা আমাকে অনেক বেশি কষ্টে পোড়ায় তেমনিভাবে মাথা উচু করে বাঁচতে অনুপ্রেরণা দেয়। আপনারা জানেন নয় মাস যুদ্ধের মাধ্যমে আমরা একটি স্বাধীন ভু-খন্ড, একটি পতাকা, রাশি-রাশি মুক্ত নিঃশ্বাস পেয়েছি। আমার স্বামী একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ।আমি গর্বিত, আমি একজন মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী।

যখন যুদ্ধ শুরু হয়, তখন আমার সজলের বয়স মাত্র ছয় বছর। দেশের টানে, মাটির টানে আমাকে ও আমার সন্তানকে আল্লাহর কাছে হাওলা দিয়ে, দেশ স্বাধীনের যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। সেদিন গভীর রাতে, প্রায় পাঁচ মাস পরে আমাদের সাথে সাক্ষ্যতের জন্য আসেন। প্রচন্ড ক্লান্ত আর জীর্ণ-শীর্ণ লাগছিল তাকে, রাজ্যের সমস্ত ঘুম গুলো যেন তার পাঁপড়িতে এসে ভর করেছে। শেষ একমুষ্ঠি মুড়িও শেষ হয়ে গেছে। কিছু যে খেতে দিব তার সাধ্যও আমার ছিল না। এত কষ্টের মধ্যেও উনি প্রফুল্লচিত্রে বলছিলেন তাসফিয়া আমরা শীঘ্রই মুক্ত হবো, একটি স্বাধীন মানচিত্র পাবো। পাবো বাক-স্বাধীনতা, তৃপ্ত নিঃশ্বাস। উনার স্পৃহায় আমিও বেশ চনমনে হয়ে, নতুন করে আশায় বুক বাধলাম। আমি বললাম তোমরা জিতবে। বিপ্লবীরা কখনো হারে না।তাসফিয়া, আমার যদি কিছু হয়, তুমি কষ্ট পেওনা। আমার সজলকে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসাবে সৎ, দেশপ্রেমিক হিসাবে গড়ে তুলবে।

তারপরই বিভীষিকা,পাক হানাদার বাহিনী আমাদের বাড়ি ঘিরে ফেলে। আমার সামনেই তাকে বুট দিয়ে ফুটবলের মতো লাথি দিতে দিতে উঠানের মধ্যখানে নিয়ে আসে। তারপর তাকে এলোপাথাড়ি গুলি করে শহীদ করে ফেলে। আর সজল, ও……ও ওর আব্বুকে বাঁচাতে গুলির মুখে ঝাঁপিয়ে পড়ে। আমার সজলকে যে পঙ্গু দেখছেন, সেদিন ওর পায়েও গুলি লেগেছিল।

আমি আমার সাধ্যের শেষ প্রান্তে এসে আপনাদের দ্বারস্থ হয়েছি। স্বাধীন দেশ তৈরীর একজন সৈনিকের স্ত্রী হিসাবে আপনাদের নিকট ভিক্ষা চাচ্ছি। আমার সজলের চিকিৎসার জন্য সহযোগিতা করুন। দয়া করে আমাকে ফিরিয়ে দিবেন না।

সজল–
দয়া করে আমার চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন, আমি আবার হাঁটতে চাই। আমি পড়তে চাই।

তাসফিয়া ও সজলের অভিনয় এত নিখুঁত ছিল, সবার চোখে পানি চলে এসেছে। অনেকেই খুশি হয়ে টাকা বকশিস দিয়েছে। বকশিস হিসাবে প্রায় হাজার দুয়েক টাকা পেয়েছে। কিন্তু তাসফিয়ার সেদিকে মন নেই। অভিনীত শহীদ মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রীর ব্যাথাটা সত্যিই তাকে আবেগে আপ্লুত করেছে। সে ভাবছে, দেশ স্বাধীনের পরে যদি বীরদের যথার্থ মূল্যায়ন না হয়, তাহলে স্বাধীনতার মানে কি? পত্রিকার বেশকিছু নিউজ তার চোখে ভেসে উঠছে “উমুক মুক্তিযোদ্ধা রিক্সা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন, উমুকজন বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে, উমুক মুক্তিযোদ্ধার ছেলে বোতল কুড়িয়ে খায়”………। রাষ্টীয় ও ব্যক্তিগতভাবে আমাদের দায়বদ্ধতা কতটুকু? তাদের মাধ্যমে প্রাপ্ত তৃপ্ত নিঃশ্বাসের মূল্যায়ন কি অবহেলায় দিচ্ছিনা!!!

তাসফিয়ার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছে– আমাদের মাফ কর,আমরা স্বার্থপর জাতি………।

দয়াকরে লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০১৮-২০১৯ নবরঙ
Design BY NewsTheme