লেখা আহবান
প্রিয় লেখক বন্ধু, আপনার লেখা সবচেয়ে সুন্দর উপন্যাস, সায়েন্স ফিকশন, ভ্রমণকাহিনী, ফিচার, স্বাস্থ্য কথা ইত্যাদি পাঠিয়ে দিন এই মেইলে– noborongpotrika@gmail.com
তাজেলের খুশি- রায়হান লাবিব

তাজেলের খুশি- রায়হান লাবিব


বাবা-মায়ের একমাত্র মেয়ে তাজেল। তার কোনোকিছুর অভাব ছিলো না। লাল-নীল জামা, জুতো-মুজো, চুল বাঁধার জন্য হরেক রঙের ফিতা, লিপস্টিক, রেশমি চুড়ি এবং আরও অনেক কিছু ছিলো। কিন্তু তার মনে শুধু একটাই দুঃখ ছিলো। তার কোনো ভাই বা বোন ছিলো না। সে রোজ স্কুলে যেত। স্কুলে টিফিনের সময় তার সহপাঠীদের সাথে অনেক হই-হুল্লোড় করতো। কিন্তু বাড়িতে ফিরলে তার মন খারাপ হয়ে যেতো। বাড়িতে যে কারও সাথে একটু দৌড়-ঝাপ করবে, কারও সাথে যে ঝগড়া করে একটু আড়ি করবে সেরকম কেউ ছিলো না। তাই বাড়িতে সে প্রতিদিন মনমরা হয়ে থাকতো।

একদিন স্কুলে যাওয়ার সময় তার সমবয়সী একটা মেয়েকে দেখতে পেলো সে পাতা কুড়াচ্ছে। মেয়েটার চুলগুলো উষ্কখুষ্ক, গায়ে একটি ছেঁড়া জামা, মলিন দুটো পায়ে হাটু অব্দি ধুলোবালি লেগে আছে।

তাজেল মেয়েটির দিকে এগিয়ে গিয়ে মেয়েটিকে বললো, এই তোমার নাম কী? মেয়েটি একটু ভয় পেয়ে বললো, জ্বি মেমসাব আমার নাম আলু। তাজেল হেসে বললো, আলু? মেয়েটি বললো আলু, আলু। তাজেল বুঝতে পারলো ওর নাম আনু। তাজেল বললো, তুমি থাকো কোথায়? আনু বললো, ওই যে সামনের বস্তিটা আছে লা, প্রথমে যে একটা গলি আছে লা, ওইখানে থাকি। তাজেল জিজ্ঞেস করলো, তোমার কে কে আছে? আনু বললো, আমার কেউ লি। দাদির সাথে থাকি। তাজেল আনুকে বললো, আমার সাথে খেলবে? আনু বললো, ঠিক আছে।

তাজেল আনুকে টিফিনের সময় পর্যন্ত সেখানে থাকতে বলে স্কুলে চলে গেলো।

স্কুলের টিফিনের সময় হলে তাজেল এসে দেখলো আনু তখনো পাতা কুড়াচ্ছে। তখন সে আনুর হাত ধরে আনুকে স্কুলের মাঠে নিয়ে গেলো এবং সেদিন সে আনুর সাথে অনেক খেললো। আনুকে পেয়ে তাজেলের কি খুশি!

টিফিনের সময় শেষ হলে তাজেল আনুকে পরেরদিন আবার আসতে বলে স্কুলে চলে গেলো।

পরেরদিন টিফিনের সময় তাজেল আনুকে দেখতে পেলো সে স্কুলের মাঠে পাতা কুড়াচ্ছে। তখন সে আনুকে ডেকে তার সাথে অনেক খেললো। আনুর উষ্কখুষ্ক চুল দেখে সে তার মাথার লাল ফিতাটা খুলে আনুর মাথার চুল বেঁধে দিলো এবং পরেরদিন তাকে আবার আসতে বললো।

স্কুল ছুটি হলে তাজেল বাড়িতে চলে গেলো। বাড়িতে যাওয়ার পর তাজেলের মা তাজেলের খোলা চুল দেখে বললো, তাজেল, তোমার মাথার চুল খোলা কেনো? চুল বাঁধার ফিতা কোথায়? তাজেল বললো, না মানে, আম্মু, ফিতাটা মাথা থেকে খুলে কোথায় যেন পড়ে গেছে। তাজেলের আম্মু বললো ঠিক আছে নতুন একটা কিনে দেবো।

পরেরদিন আবারও স্কুলের টিফিনের সময় তাজেল আনুর দেখা পেল। সেদিনও সে অনেক খুশি হয়ে তাজেলের সঙ্গে অনেক খেললো। টিফিনের সময় যখন প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, তাজেল হঠাৎ আনুর পায়ের দিকে তাকিয়ে তার খালি পা দেখে নিজের জুতো জোড়া খুলে আনুকে পড়তে বললো। আনু পড়তে না চাইলেও তাজেলের জোরাজুরিতে পড়তে হলো। তাজেল আবারও তাকে পরেরদিন আসতে বলে ক্লাসে চলে গেলো।

তাজেল যখন বাড়িতে ফিরলো, তার মা তার খালি পা দেখে অবাক হয়ে গেলো। তাজেলের মা বললো, একি তাজেল, তোমার জুতো কোথায়? তাজেল ইতস্তত করে বললো, আসলে হয়েছে কি আম্মু, টিফিনের সময় আমি জুতো খুলে হাত মুখ ধুতে গিয়েছি। কিন্তু ফিরে এসে দেখি জুতো আর নেই। আমার খুব খারাপ লেগেছে আম্মু। তার আম্মু তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললো, ঠিক আছে, নতুন জুতো কিনে দেবো।

তার পরেরদিন সকালে তাজেল তার একটা নীল জামা চুপিচুপি স্কুল ব্যাগের ভিতরে ঢুকিয়ে রাখলো। স্কুল যাওয়ার আগে সে মায়ের কাছে টিফিনের জন্য খাবার চেয়ে নিলো। এতেও তার মা একটু অবাক হয়ে গেলো। কারণ তাজেল টিফিন নিয়ে যেতে সবসময় অমত করতো। তার মা জোর করে টিফিন দিয়ে দিলেও সে না খেয়েই বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে আসতো।

সেদিন টিফিনের সময় তাজেল তার স্কুল ব্যাগে করে লুকিয়ে নিয়ে আসা নীল জামাটি আনুকে পড়িয়ে দিলো এবং টিফিনের খাবার তাকে খাওয়ালো।

তাজেল প্রতিদিন আনুর সাথে এভাবে দেখা করে খেলতো এবং প্রতিদিন তাকে কিছু না কিছু এনে দিতো। কোনোদিন মাথার ক্লিপ, কোনোদিন লাল-নীল টিপ, কোনোদিন রেশমি চুড়ি, কোনোদিন বা জামা-জুতো দিতো আর প্রতিদিন বাড়ি থেকে টিফিনের জন্য খাবার নিয়ে এসে আনুকে খাওয়াতো। বাড়ি ফিরে তাজেল প্রতিদিন একটা না একটা মিথ্যে বলতো।

হঠাৎ এরুপ আচরণে তাজেলের মা তাজেলকে সন্দেহ করতে শুরু করলো। একদিন স্কুলে যাওয়ার সময় তাজেলের মা চুপিচুপি তাজেলের পিছু পিছু যেতে লাগলো।

স্কুলে যাওয়ার সময় সেদিন তাজেল পথে আনুর দেখা পেলো। আনু ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলো। তাজেল জিজ্ঞেস করাতে আনু বললো, আমার দাদির খুব অসুখ। তাজেল সবকিছু শুনে তার টিফিনের খাবারটা আনুর হাতে দিলো এবং তার কাছে বিশ টাকা ছিলো সেটাও বের করে আনুকে দিলো। তাজেলের আম্মু চুপিচুপি সব দেখে বাড়িতে চলে গেলো।

তাজেলের আম্মু বাড়িতে ফিরে গিয়ে তাজেলের আব্বুকে সবকিছু জানালো।

দুদিন পর তাজেল স্কুলে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিলো। তাজেলের বাবা তাজেলকে ডেকে বললো, তাজেল মামনি, আজকে তোমার জন্য একটা গিফট আছে। তাজেল উৎসুক চোখে বললো, কী গিফট আব্বু? তাজেলের আব্বু বললো, আজকে তোমার জন্য একটা বোন এনেছি। তাজেল উৎফুল্ল হয়ে বললো, কোথায় আমার বোন? তাজেলের আব্বু ও আম্মু আগেই আনুকে এনে রেখেছিলো। তাজেলের আম্মু অন্য একটা ঘর থেকে আনুকে নিয়ে আসলো। আনুকে দেখে তাজেল খুশিতে তার আব্বুকে জড়িয়ে ধরলো। তার আব্বু বললো, আজ থেকে তোমরা একসাথে স্কুলে যাবে। তাজেল বললো, আব্বু-আম্মু, আমি আর কোনোদিন মিথ্যে কথা বলবো না।

তাজেলের আম্মু আনুকে নতুন জামা পড়িয়ে দিলো। আনু ও তাজেল হাত ধরাধরি করে একসাথে স্কুলে চলে গেলো।

দয়াকরে লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০১৮ নবরঙ
Design BY NewsTheme