লেখা আহবান
প্রিয় লেখক বন্ধু, আপনার লেখা সবচেয়ে সুন্দর উপন্যাস, সায়েন্স ফিকশন, ভ্রমণকাহিনী, ফিচার, স্বাস্থ্য কথা ইত্যাদি পাঠিয়ে দিন এই মেইলে– noborongpotrika@gmail.com
সুবাইতার কান্ড- হাজেরা সুলতানা হাসি

সুবাইতার কান্ড- হাজেরা সুলতানা হাসি

বাবা-মায়ের একমাত্র আদরের মেয়ে সুবাইতা।খুবই চঞ্চল। ওর কথা বলার ভঙ্গি এতোই চমৎকার যে, কথা বলার সময় ওর অবয়বপানে তাকিতে থাকতে ইচ্ছে করে। সুবাইতাকে এবার স্কুলে ভর্তি করাবেন মা-বাবা ঠিক করলেন। শুনে তো সুবাইতার সে কী আনন্দ। পাশের বাসার আন্টির মেয়ে স্নিগ্ধার মতো ওর ও থাকবে অনেক সহপাঠী, যাদের সাথে খুব মজা করবে ও। ওর তো কোন খেলার সাথী নেই। ও ছোট বলে ওকে বাইরে বেরোতে দেওয়া হয় না। স্নিগ্ধা তো বিকেল হলেই টেনিসকোর্টে গিয়ে ওর সহপাঠীদের সাথে খেলে। ও তখন ঝুল বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখে গাড়ীর ছোটাছুটি, মানুষের হৈ হোল্লোড়। এসবই দেখে ওকে বিকেলের মুহুর্তটা পার করতে হয়। এ ছাড়া যে ওর কোনো উপায় নেই। ছোট বলে ও ফ্লাটের অদূরে টেনিসকোর্টে যেতে পারে না। মা-বাবার কথা হলো, আরেকটু বড় হও তারপর যাবে। সপ্তাহ খানেক পর ওর জন্মদিন। পাঁচ থেকে ছয় বছরে পা দিবে। সুবাইতা তো মহাখুশি, সেই দিনটির অপেক্ষায় প্রহর গুণতে গুণতে ওর সময় কাটে। কারন জন্মদিন এলেই তো বড় হয়ে যাবে। তখন আর কেউ ওকে বাঁধা দিতে পারবে না।
সুবাইতার ভাবনার মাঝে উঁকি দেয়– ইশ, যদি দু’দিন পর পর জন্মদিন আসতো তাহলে অল্প ক’দিনেই তো ও স্নিগ্ধা আপুর মতো বড় হয়ে যেতো। সুবাইতা! খেতে এসো তাড়াতাড়ি। মায়ের ডাকে সুবাইতা সম্মিৎ ফিরে পায়, ছোট্ট পায়ে তিড়িং বিড়িং নেচে নেচে ছুটে যায় মায়ের ডাকের আহবানে সাড়া দিতে….। সুবাইতা এখন স্কুলে যায় নিয়মিত। বাবার হাত ধরে স্কুলে যাওয়া, ক্লাসে গিয়ে সহপাঠীদের সাথে মজার মজার গল্প করা সব মিলিয়ে খুব আনন্দে দিন পার করছে সুবাইতা। সুবাইতার প্রথম সাময়িক পরিক্ষা শেষ হলো। ছুটিটা গ্রামের বাড়ীতে কাটালো। সারাদিন কাজিনদের সাথে খেলা-ধুলা, হাসি-আনন্দে মেতে উঠা ইত্যাদিতে ছুটিটা বেশ উচ্ছাসে পার করলো।
বাসায় যাওয়ার দু’দিন পরই রেজাল্ট প্রকাশ হলো, প্লে-তে পঞ্চম স্থান অধিকার করলো সুবাইতা। বাবার সাথে রেজাল্ট আনতে গেলো সুবাইতা। পঞ্চম স্থান শুনে সুবাইতার মনটা ভার হয়ে গেলো।
ওর মলিন মুখ দেখে ওর বাবা জিজ্ঞেস করলেন, কি হয়েছে মামণি তোমার? মুখটা এমন ভার করে আছো কেন? সুবাইতা তখনই কান্নাজড়িত কন্ঠে বললো, স্নিগ্ধা আপু কতো ভালো রেজাল্ট করে বিশ, একুশ নাম্বার হয় অথচ আমি হলাম মাত্র পাঁচ! কথাগুলো বলে কাঁদতে শুরু করলো সুবাইতা। সুবাইতার কথা শুনে তো বাবা ওমর ফারুক একদম আক্কেল গুড়ুম! বলে কি মেয়েটা।
মেয়েটাকে যতো বুঝাতে চেষ্টা করেন যে, রেজাল্ট এর বেলায় যতো কম নাম্বার হওয়া যায় ততোই ভালো। কিন্ত কে শোনে কার কথা! সুবাইতা তো ভাবছে ওকে শান্তনার জন্য বাবা এসব বলছেন।
বাসায় পৌঁছার পর মা সব শুনে বোকা বনে গেলেন।
বুঝলেন, মেয়েটার স্নিগ্ধার রেজাল্টের কারনেই এ মনোভাব তৈরী হয়েছে। ওদের আশপাশে বাসার কোন ছেলে-মেয়ে নেই কেবল স্নিগ্ধা ছাড়া। আর দু’তিন জন আছেন মহিলা উনারা নিউ ম্যারিড বাচ্ছা নেই কারো। স্নিগ্ধা তো বরাবরই রেজাল্ট এমন করে পড়ায় তেমন একটা ভালো না। স্নিগ্ধা ক্লাস সিক্সে পড়ে। ও ছোট বলে ওকে খেলায় স্নিগ্ধা নিতে চায় না, কিন্ত সুবাইতা ওকে ছাড়া কিছুই বুঝে না।
সারাক্ষণ একা থাকে তাই স্নিগ্ধাকে অল্প সময়ের জন্য কাছে পেলেও ও মহা খুশি।
যাইহোক, বাসায় যাওয়ার পর থেকে কিছুই মুখে পুড়ছে না সুবাইতা। অনেক বুঝানোর পরও সুবাইতার একই কথা ও পাঁচ হতে চায়নি স্নিগ্ধার মতো ওর বিশ-পঁচিশ নাম্বার হওয়া চা-ই চাই। হঠাৎ মা পারভীনের মাথায় একটা বুদ্ধি এলো।
তাই তিনি স্নিগ্ধার পাশে বসে আলতো করে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, সত্যিই মা তুই ঠিকই বলেছিস, পাঁচ তো মাত্র। আমি যখন স্কুলে পড়তাম তখন একশত বা দুইশত হতাম।
তুমিও চাইলে এমন ড়েজাল্ট করতে পারবে।
পদ্ধতি কিন্ত আমার জানা আছে, শোনবে তুমি?
মায়ের কথা শুনে তো সুবাইতা মহাখুশি, একশত নাম্বার হলে ও স্নিগ্ধা আপুর চেয়ে অনেক এগিয়ে থাকবে, তখন আর স্নিগ্ধা আপু ওকে খেলায় নিতে অনাগ্রহী হবেনা ওকে নিয়েই টেনিসকোর্টে যাবে। সুবাইতা যতেষ্ট আগ্রহ নিয়ে মায়ের মুখপানে তাকালো, মিষ্টি করে বললো, হ্যাঁ মা, বলে দাও আমায় পদ্ধতি। মা সোহানা খানম মিষ্টি হেসে বললেন, তোমার মন দিয়ে পড়তে হবে। আগের চাইতে দ্বিগুণ পড়তে হবে। তাহলেই তুমি পারবে একশত নাম্বার হতে।
মায়ের কথা শুনে সুবাইতার খুশি আর ধরে না। মায়ের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে বললো, দেখে নিও আমি একশত নাম্বার হবোই।
দ্বিতীয় সাময়িক পরিক্ষা শেষে রেজাল্ট আনতে বাবার সাথে স্কুলে ছুটলো মায়াবী চেহারার অধিকারী মিষ্টি মেয়ে সুবাইতা। রাস্তায় হেটে যেতে যেতে বাবাকে বিভিন্ন প্রশ্ন করে বাবার একদম বেহাল অবস্থা করে দিল। ধৈর্যের সাথে মেয়ের সব প্রশ্নের উত্তর দিলেন, কারণ অভিমানী মেয়েটিকে অল্প ধমক দিলেই সারাদিন ওর পিঁছে পিঁছে ছুটে অভিমান ভাঙাতে এই ভুলের মাশুল দিতে হয়। রেজাল্ট কার্ড দেখে তো বাবা ওমর ফারুক চমকে গেলেন নিজের চোখকে যেনো বিশ্বাস করাতে পারছেন না। এ কি! স্বপ্ন!! নাকি মতিভ্রম!!
নাকি বাস্তব?!
তার একমাত্র আদুরী মেয়ে সুবাইতা সব বিষয়ে আটানব্বই, নব্বইয়ের উর্ধ্বে পেয়ে এক নাম্বার হয়েছে। শুধু তাই নয়
স্কুলের মধ্যে সেরা হয়েছে সবাইকে পিঁছু ফেলে।
সুবাইতার টিচার ম্যামরা সুবাইতাকে কনগ্রাচুলেশন জানাচ্ছে। সুবাইতা যখন জানতে পারলো ও এক নাম্বারে ফাষ্ট হয়েছে। মনটা কালো মেঘে ঢেকে
গেলেও এখন টিচারদের এমন কান্ডকারখানা দেখে অবাক হলো, এক হওয়াতেই এতো খুশি!
তাহলে আগেরবার পঞ্চম হওয়াতে খুশি হলেন না কেন?
একশো নাম্বার! হলে কি আরো বেশি খুশি হতেন?
দ্বিধার ঘোর কাটানোর জন্য কানে কানে বাবাকে বললো মনের কথা, বাবা! আমি এক
নাম্বার হওয়াতে টিচাররা এতো খুশি তাহলে কি একশত নাম্বার হলে আরো বেশি
খুশি হতেন?
মেয়ের কথা শুনে ওমর ফারুক হেসে ওঠলেন,
টিচাররা পাশে বসা ছিলেন সমস্বরে জিজ্ঞেস করলেন কি হয়েছে?
কি বললো পাকনী বুড়িটা?
ওমর ফারুক কিছু বলার আগেই সুবাইতার ইংলিশ টিচার পারভীন বললেন, নিশ্চয় মেয়েটা বলছে বাসায় যাওয়ার আগে মিষ্টির অনেকগুলো প্যাকেট নিয়ে যেতে হবে…?
হেসে ওঠলেন সবাই ম্যামের কথা শুনে। না, না তা না আসল ব্যাপার হচ্ছে….. বললেন প্রথম থেকে পুরো কাহিনী এবং মেয়ের মায়ের বুদ্বির প্রশংসা করলেন। লজ্জা আর অপমানে সুবাইতার মুখ লাল হয়ে গেলো।
বাংলা টিচার সুবাইতার পাশে এসে বললেন,
পড়া-লেখার ক্ষেত্রে একশ, দুইশ এসবের কোন মূল্য নেই, মূল্য হলো যারা এক, দুই, তিন এরকম রেজাল্ট করে তাদের। তাইতো দেখ, আজ তোমার এ রেজাল্টে আমরা এতো আনন্দিত।
সুবাইতা নিজের ভেতর রাখা প্রশ্নকে আর চেপে রাখতে পারলো না। বাবার দিকে
তাকিয়ে বললো– তাহলে মাম্মি যে বললো
মাম্মি একশ-দুইশো নাম্বার হতেন আর মাম্মিকে সব্বাই খুব আদর করতো…? সুবাইতার কথা শুনে আবারো হাসির রোল পড়লো স্কুল অফিস কক্ষে। বাবা বললেন, তোমার মা তো তোমার ভালোর জন্যই বলেছেন,
কারন তখন তো তুমি একশ দুইশকেই মনে করতে অনেক বেশি, তাই বুদ্ধি করে এমনটা
বলেছেন। বুঝলে এবার আমার পাকনী মামণি?
আর এজন্য তোমার মাকে তোমার উচিৎ ধন্যবাদ দেওয়া। পাশ থেকে বলে ওঠলেন অংক
টিচার রাহুল।
হুম তাইতো, চলো তোমার মাম্মিকে ধন্যবাদ জানাবো।
হুম চলো, বলে এক ঝাঁক খুশির ছ’টা নিয়ে বাসায় যাওয়ার জন্য উদ্দ্যত হলেন
সুবাইতার বাবা ওরফে ওমর ফারুক।

দয়াকরে লেখাটি শেয়ার করুন

One response to “সুবাইতার কান্ড- হাজেরা সুলতানা হাসি”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০১৮-২০১৯ নবরঙ
Design BY NewsTheme