লেখা আহবান
প্রিয় লেখক বন্ধু, আপনার লেখা সবচেয়ে সুন্দর উপন্যাস, সায়েন্স ফিকশন, ভ্রমণকাহিনী, ফিচার, স্বাস্থ্য কথা ইত্যাদি পাঠিয়ে দিন এই মেইলে– noborongpotrika@gmail.com
ভূত ছেলেটা- মাহাথির আরাফাত

ভূত ছেলেটা- মাহাথির আরাফাত

ক্লাসে গমগমে ভাবটা এখন আর নেই। সবাই নিশ্চুপ। মনে হচ্ছে কারও মুখে কথা ফুটেনি এখনও। সবাই যেন চার মাস বয়সের শিশু। কুদ্দুস স্যার, যিনি আমাদের অঙ্কের শিক্ষক। তিনি একটু আগে ব্ল্যাকবোর্ডে পাঁচটা অঙ্ক দিয়েছেন। তাও আবার বইয়ের বাইরে থেকে। মহাঝামেলা। দুইটা সমাধান করে সবাই বসে আছে। বাকি তিনটা কেউ পারছে না। এদিকে স্যার বলে গিয়েছেন অন্তত তিনটা যে পারবে তার উপর কোনো বেত পড়বে না। কুদ্দুস স্যার ক্লাসে নেই। তিনি অঙ্ক দিয়ে অফিসে বসে চা খাচ্ছেন। কখন যে এসে একটা হুংকার দেন বলা যায় না।

হঠাৎ মিশু লাফিয়ে উঠল, ‘পেরেছি, আমি তিনটা পেরেছি। কি মজা!’ পাশের বেঞ্চে বসা সাজ্জাদ বলল, ‘দেখা, আমাদের দেখা। তাড়াতাড়ি দেখা। ‘মিশু একটা বদের হাড্ডি। বলল, ‘উঁহু দেখানো যাবে না। অনেক কষ্টে করেছি দেখালে আমার কষ্টের মূল্য থাকবে না।’

মিশুর আচরণে সবার মেজাজ বিগড়ে গেল। এখন আমরা কী করব! কোনোভাবেই যখন আমরা তিনটা অঙ্ক করতে পারছি না, তখন ব্ল্যাকবোর্ডে দেখা গেল অদ্ভুত এক জিনিস। যে অঙ্কটা নিয়ে সবাই মাথা ঘামাচ্ছে সেটাই সমাধান করা। সবাই একে অপরের দিকে মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে। এ কী করে সম্ভব! ব্ল্যাকবোর্ডে অঙ্ক করল কে? মিশু তো তার জায়গাতেই বসে আছে। তাছাড়া মিশুও মুখ হা করে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।

সবাই সাত পাঁচ না ভেবেই খাতায় অঙ্কটা উঠাতে লাগল। মিশু হিংসায় ডাস্টার দিয়ে অঙ্কটা মুছতে গেল, অমনি তার হাত কেঁপে উঠল আর চেঁচাতে লাগল। মিশুর চিৎকারে কুদ্দুস স্যার দৌড়ে এলেন। উনার হাতে আড়াই হাত লম্বা একটা বেত। সবাই ঢোক গিলল। সবার অঙ্কও করা শেষ এবং সাথে সাথে ব্ল্যাকবোর্ডের অঙ্কটা মুছে গেল। কুদ্দুস স্যার কিছুই বুঝতে পারলেন না।

কুদ্দুস স্যার বললেন, ‘কিরে মিশু এভাবে চেঁচালি কেন? ‘ মিশু বলল, ‘স্যার, আমার হাতে কে যেন একটা জোরে বাড়ি মারল। এমন জোরে বাড়ি আমি এখনো খাইনি। হাতটা মনে হয় স্যার ভেঙে গেছে। উহু স্যার ব্যথা করছে। ‘মিশু ব্যথায় উহু আহ করছে। কুদ্দুস স্যার বললেন, ‘মিশুর হাতে বাড়ি দিল কে? ‘কেউ কোনো কথা বলল না। সাজ্জাত বলল, ‘স্যার, ওকে কেউ বাড়ি মারেনি। ও ডাস্টার নিয়ে ব্ল্যাকবোর্ডে যাচ্ছিল, তখনই ও চেঁচিয়ে উঠল। ‘কুদ্দুস স্যার বলল মিশুকে, ‘ডাস্টার নিয়ে কেন তুই ব্ল্যাকবোর্ডে গিয়েছিলি? ‘মিশু বলল, ‘স্যার, ব্ল্যাকবোর্ডে একটা অঙ্ক করা ছিল সেটা মুছতে….। ‘সবাই বোর্ডে তাকাল। কিন্তু বোর্ড তকতকে পরিষ্কার, কোনো লেখা নেই। কুদ্দুস স্যার বললেন, ‘কই অঙ্ক কই? বোর্ড তো খালি। যা জায়গায় গিয়ে বস্।’

মিশু চুপসে গেল। বলার মতো কিছু নেই। এই মুহূর্তে সবাই তার বিপক্ষে অবস্থান নিবে এটা সে বুঝতে পারল। সে বাধ্য ছেলের মতো তার বেঞ্চে গিয়ে বসলো।

কুদ্দুস স্যার চেয়ারে বসলেন। আমাদের সপ্তম শ্রেণিতে সব স্যারই ক্লাস নিতে এলে মজা পান। কারণ এই ক্লাসেই উন্নত ধরনের চেয়ার-টেবিল আছে যা অন্য কোনো ক্লাসরুমে নেই। স্যার তৃপ্তির ঢেঁকুর তুললেন। তারপর মিশুকেই ডাকলেন খাতা দেখাতে। প্রথম দুইটা অঙ্কে স্যার খচ খচ করে রাইট চিহ্ন দিলেন। তিন নাম্বারটায় ক্রস চিহ্ন দিলেন। স্যার খিক খিক করে বেদম হাসলেন, ‘এই বেয়াদব তুই পিথাগোরাসের ভাতিজা নাকি? নিজে অঙ্কের নিয়ম বানাচ্ছিস?’

‘স্যার, আমি তো এটা ঠিকঠাকই করেছিলাম। কেউ মনে হয় বেতালা করেছে।’

স্যার মিশুকে দুইটা বেতের বাড়ি দিলেন। আর কেউই বাড়ি খেলো না। সবারই তিনটা অঙ্ক হয়েছে। স্যার অসম্ভব খুশি হয়েছেন। কিন্তু আমরা পড়ে গেলাম ভাবনায় অঙ্কটা বোর্ডে কে করল আর কে’ইবা মুছলো।

গতকাল গণিত ক্লাস পরীক্ষা হয়েছিল। কুদ্দুস স্যার খাতা দিবেন এখন। মিশু বরাবরই ভালো নাম্বার পায়। কিন্তু আজ পেল মাত্র দশ। আমরা মিশুর নাম্বার শুনে অবাক হলাম। স্যার বললেন, ‘মাত্র দশ পাবার কারণ কী, মিশু? ‘মিশুর মুখে কথা নেই। সাজ্জাদ বলল, ‘স্যার, এটা কোনো ব্যাপার না। তামিম-ইকবালও মাঝে মধ্যে শূন্য রানে আউট হয়। তাই বলে কি সে খারাপ ব্যাটসম্যান? মিশুর ক্ষেত্রেও এমনটা ঘটেছে।’

টিফিন পিরিয়ডে আমরা সবাই ঝালমুড়ি খাচ্ছি ক্লাসে বসে (তবে মিশু নেই)। এমন সময় আমাদের বয়সী একটা ছেলে এল আমাদের সামনে। আগে কখনও তাকে আমরা কেউ দেখিনি। কথাবার্তা ভারি অদ্ভুত। তার বাড়ি নাকি আমাদের স্কুলের পাশেই। অথচ আমরা এই ছেলেকে আগে দেখিনি। নান্টু বলল, ‘তুমি থাক কোথায়?’

‘খেজুর গাছটায়।’

‘মানে কী।’

‘মানে হলো আমি তো মানুষ না। একটা ভূতের বাচ্চা। রাগ করে বাসা থেকে বের হয়ে এসেছি।’

আমাদের সবার আক্কেল গুড়ুম হওয়ার মতো অবস্থা। কী বলছে এই ছেলে! সবাই হি হি হো হো হা হা করে হেসে দিল। ছেলেটা ইতস্তত করে বলল, ‘হাসবে না। আমি তোমাদের সাহায্য করেছি। ব্ল্যাকবোর্ডে অঙ্ক করে দিয়েছি। মিশুকে শায়েস্তা করেছি। বাড়ি দিয়েছি একটা, আর অঙ্কে মাত্র দশ পাইয়ে দিয়েছি। ‘কথাটা বলেই সে খিক খিক করে হাসতে লাগল। যেন সে খুব মজা পেয়েছে।
আমরা সবাই স্তব্ধ হয়ে গেলাম। একটা ছেলে এসে বলছে যে সে নাকি ভূতের বাচ্চা। এমন তেলেছমাতি ঘটনা তো আমাদের সামনে আর ঘটেনি।

ছেলেটা ক্লাসের পিছনের বেঞ্চে গিয়ে বসল। দেখে মনে হচ্ছে কোনো কিছু নিয়ে চিন্তিত। রনির আবার বিচ্ছিরি স্বভাব। সে বলল, ‘এই ছেলে আমাদের ক্লাসে কী? কোথ্থেকে যে এসব পাগল-ছাগল আসে।’

‘আমি পাগল-ছাগল না। আমি একটা ভূত। বিশ্বাস কর আমি একটা ভূত। মানুষের রূপ নিয়ে এসেছি। আমি বাসা থেকে পালিয়ে এসেছি। কারণ আমি পরীক্ষায় ফেল করেছি। আমাদের ভূতদের অঙ্ক সাংঘাতিক কঠিন। সেই তুলনায় তোমাদেরটা খুবই সহজ।’

আমাদের সবার হাসি পাচ্ছে। কী করা যায়? সবাই ভাবছি। সাজ্জাদ বলল, ‘তোমার কাছে কী প্রমাণ আছে যে তুমি ভূত। প্রমাণ না দিতে পারলে মেরে এক্কেবারে কঠিন থেকে গ্যাসীয় অবস্থায় করে দেব, বেয়াদব।’

‘এই দেখ আমি মিলিয়ে যাচ্ছি। আমাকে তোমরা দেখতে পারবে না।’

আমাদের চোখকে আমরাই বিশ্বাস করাতে পারছি না। এ কী করে সম্ভব? ছেলেটা গেল কোথায়? একেবারে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। আমাদের সবার চোখ কপালে ওঠে গেল। নান্টু আর রনি ছেলেটাকে ডাকল বেশ কয়েকবার। কিন্তু কোনো সাড়াশব্দ নেই। সবাই স্বীকার করতে বাধ্য হলো যে ছেলেটা ভূত। আমাদের খারাপ লাগল এটা ভেবে যে ছেলেটা আমাদের সাহায্য করেছে। বোর্ডে অঙ্ক করে দিয়েছে। অহংকারী মিশুকে একটু টাইট দিয়েছে। অথচ আমরা ওর সঙ্গে বাজে আচরণ করেছি।

ভূতের কথা শুনে সবাই ভয় পায়। কিন্তু এই মুহূর্তে কেউই নার্ভাস হচ্ছে না। আমরা ঠিক করলাম এই ঘটনা বাইরের ক্লাসের কাউকে বলব না। ছেলেটা যদি আবার আসে, তাহলে খুব ভালো হতো। ওর সঙ্গে বন্ধুত্ব করে ফেলতাম। ভূতের সঙ্গে বন্ধুত্ব মানেই তো বাজিমাৎ। ইশ্!

পরের দিনে স্কুলে আবার আমাদের ক্লাসে ওই ছেলেটা এল। তবে কোনো রূপ ধরে নয়। আমরা বুঝতে পারলাম ছেলেটা আমাদের ক্লাসেই আছে। কারণ অঙ্ক ইংরেজি সব ক্লাসেই সে পড়া বলে দিয়েছে আমাদের কানে কানে। আমাদের যে কী খুশি লাগছে তা বলে বোঝানো যাবে না। তবে মিশুর সাথে ওর মনে হয় বহু দিনের ঝগড়া। কারণ মিশুকে কোনো পড়া বলে দেয়নি। ব্ল্যাকবোর্ডে অঙ্কটা মুছতে গিয়েছিল বিধায় মিশুর সাথে আড়ি মনে হয়।

টিফিন পিরিয়ডে ছেলেটা আবার মানুষরূপে এল। আমরা আনন্দে নেচে উঠলাম। সে আমাদেরকে অনেকগুলো মজাদার চকলেট দিল, খেতে খুব স্বাদ। আমরা ইতস্তত করতে লাগলাম। সে বলল– ‘খাও, সমস্যা নেই। আমাদের সমাজে মাত্র এক টাকায় আটটা পাওয়া যায়।’

রনি আবার একটু বেশি শিক্ষিত। টাট্টু ঘোড়ার ইংরেজি কী তাও বলতে পারবে। সে বলল, ‘বাপরে এটা কি শায়েস্তা খানের আমল নাকি? এক টাকায় আটটা পাওয়া যায়।

ছেলেটা বলল, ‘শায়েস্তা খানটা আবার কে? সে কি শায়েস্তা টায়েস্তা করে নাকি সব সময়।’

নান্টু বলল, ‘সে তুমি বুঝবে না। ও একটু বেশি কথা বলে। আচ্ছা তুমি তো ভূত। কিন্তু বাসা থেকে চলে এলে কেন?’

‘অঙ্ক পরীক্ষায় একশোতে মাত্র সত্তর পেয়েছি। আর দশ নাম্বারের জন্য পাস করতে পারলাম না। এ কারণে বাবা-মা রেগে আছে। ভূত সমাজে তারা মারাত্মক অপমানিত হয়েছে। তাই আমি বাসা থেকে চলে এসেছি। ঠিক করেছি আর যাব না। তোমাদের স্কুলে পড়ব। তোমাদের লেখাপড়া খুব সহজ।’

আমরা শুনে অবাক হলাম। আমাদের এখানে তেত্রিশে পাস। আর ওদের তাহলে আশি পেতে হয় পাস করতে হলে। আমি বললাম, ‘তাহলে এ প্লাস মার্ক কত ?’

‘এ প্লাস মার্ক হলো পঁচানব্বই। যা খুব কম ছাত্রই পায়।’

আমি আবার বললাম, ‘তুমি কি সত্যিই আমাদের ক্লাসে পড়বে?’

‘হ্যাঁ, তোমাদের মতো মানুষ হতে চাই। আগামীকালই ভর্তি হব এই স্কুলে। এই নাও আরও চকলেট আর সন্দেশ।’

ছেলেটা আমাদের মজার মজার খাবার এনে খাওয়ালো। আর পরের দিনই স্কুলে ভর্তি হয়ে গেল। ও খুব মেধাবী ছাত্র।

(পরিশিষ্ট)
আচ্ছা, এই গল্পটা কি তোমরা সবাই বিশ্বাস করেছো? জানি অনেকে নাক উঁচিয়ে বলবে, ‘অ্যাঁ মিথ্যে গল্প। ফাইজলামি করার আর জায়গা পাননা। ‘কিন্তু না, গল্পটা একদম সত্য। ছেলেটা আমাদের সাথে নিয়মিত ক্লাস করে। ওর সাথে লেখাপড়া, এমনকি খেলাধুলাতেও কেউ পারেনা। ভূত ছেলেটা ক্লাসে কী কী করে তা আরেকদিন বলব। সে পর্যন্ত সবাই ভালো থেকো। ওহ্ আরেকটা কথা ছেলেটাকে একদিন তোমাদের সবাইকে দেখাব।

দয়াকরে লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০১৮-২০১৯ নবরঙ
Design BY NewsTheme